জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংকট: সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে সরকার-বিরোধী দলের দ্বন্দ্ব
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল, যার কেন্দ্রে ছিল জুলাই জাতীয় সনদ। সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, এবং জুলাই সনদের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর, বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা ১৭ ফেব্রুয়ারি দুটি শপথ নেন—একটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে, অন্যটি গণভোট অধ্যাদেশে বর্ণিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ। তবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা এই পরিষদের শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন, যা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সূচনা করে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে মতবিরোধ
সংসদে অন্তত দুই দফা আলোচনা সত্ত্বেও সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী জোট জামায়াত-এনসিপি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। বিএনপির অবস্থান হলো, নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমতসহ যেভাবে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা প্রচলিত সংবিধান সংশোধনের রীতিনীতির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা উচিত। অন্যদিকে, জামায়াত-এনসিপি জোট দাবি করছে যে নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া জুলাই সনদের সব মূল প্রস্তাব পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা প্রয়োজন।
এই মতপার্থক্যের একটি বড় কারণ হলো জুলাই সনদে ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের ভিন্নমতগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রসঙ্গটি উল্লেখযোগ্য। জুলাই সনদে বলা হয়েছিল যে নিম্নকক্ষের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য নির্বাচিত হবেন, কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে। তাদের দাবি ছিল নিম্নকক্ষের আসনের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুসরণ করা হোক। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বিএনপির এই ভিন্নমত উপেক্ষা করে গণভোটের প্রশ্ন নির্ধারণ করা হয়, যা বিতর্কের জন্ম দেয়।
আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা
সাংবিধানিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৫ এপ্রিল সংসদে বলেন যে এই আদেশটি একটি 'কালারেবল লেজিসলেশন' বা ছদ্মবেশী আইন, এবং ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম সংসদ যাত্রা শুরু করার পর রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির এখতিয়ার নেই। তিনি এটিকে জোরপূর্বক জাতীয় প্রতারণার দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অনেকে মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছিল, এবং গণভোট-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করে জনমানসে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দল সন্তুষ্ট। আদেশে বিএনপির দাবি অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছিল, অন্যদিকে উচ্চকক্ষ গঠনে জামায়াতের পিআর পদ্ধতির দাবিকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।
ভিন্নমতসহ ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত জুলাই সনদের বাইরে গিয়ে আইন প্রণয়ন করা অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হয়। আইনি বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে সাংবিধানিক ভিত্তিহীন এই আদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিটিও আইনের দৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য
সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির নৈতিক দায়িত্ব থাকলেও সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে ধারণাগত পার্থক্য প্রকট। বিএনপির কাছে সাংবিধানিক সংস্কার মানে প্রচলিত সংবিধানের অধীনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কতিপয় বিধান সংশোধন করা, অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপির দৃষ্টিতে সংস্কার হলো ১৯৭২ সালের সংবিধানকে প্রতিস্থাপন করে নতুন সংবিধান রচনা করা। তবে এটি স্পষ্ট যে ১৯৭২ সালের সংবিধান একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে বিদ্যমান।
২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর সংবিধান সংস্কার কমিশনের সভায় সংস্কারের পরিধি ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যেখানে বর্তমান সংবিধান পর্যালোচনা এবং জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে সামগ্রিক সংশোধন, পুনর্বিন্যাস ও পুনর্লিখনের কথা বলা হয়েছিল। কমিশন হয়তো চেয়েছিল সব রাজনৈতিক আদর্শকে একত্রিত করে সমঝোতার ভিত্তিতে সংস্কার সম্পন্ন করতে, কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে ঐকমত্য কমিশন নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, যার প্রতিক্রিয়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
সংসদে বিএনপির পক্ষ থেকে আইনি যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে যে সরকারের সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কোনো সাংবিধানিক দায়িত্ব নেই, অন্যদিকে বিরোধী দল আইনি ভাষায় জুতসই জবাব দিতে পারছে না। এই অবস্থায় সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।



