সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে রাজপথে নেমেছে বিরোধী দল। সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে তারা। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ ১১ দলীয় জোট শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশ করবে গণভোটের আলোকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে। যদিও এরমধ্যেই গণভোটসহ প্রায় ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে, যেগুলো চলমান প্রথম সংসদ অধিবেশনে অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে না। এর ফলে কার্যকারিতা হারাচ্ছে এসব অধ্যাদেশ। এমন প্রেক্ষাপটে রাজপথে নামা বিরোধী দল সরকারকে কতটা চাপে ফেলতে পারবে?
বিরোধী দলের অবস্থান ও কর্মসূচি
বিরোধী দল বলছে, সংবিধান সংস্কারে দেশের জনগণ জুলাই আদেশ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি সংবিধান সংস্কার না করে তাদের পছন্দমতো কিছু বিষয় সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি জনরায়কে উপেক্ষা করা। এ কারণে ন্যায্য দাবি আদায়ে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি দিতে ৭ এপ্রিল বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। ওই বৈঠক থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করা হবে।
রাজপথে বিরোধী দলের তৎপরতা
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে নেমেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোট। উল্লেখযোগ্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টি অন্যতম। শনিবার বিকাল ৫টায় তারা বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে। দলগুলোর লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেন, "সরকার সংসদে গণভোটের সমাধান না করলে ১১ দলের উদ্যোগে আন্দোলন চলবে।" বিক্ষোভ সমাবেশের পাশাপাশি গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে জনমত গঠনের চেষ্টা করবে বিরোধী দল। একই সঙ্গে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করা হবে।
সরকারি দলের প্রতিক্রিয়া
এদিকে সরকারি দল বিএনপি বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ অস্তিত্বহীন। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন জরুরি। এজন্য সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হবে। রোববারের মধ্যেই গঠন করা হবে এ কমিটি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বুধবার সংসদে বলেন, "জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আরোপিত আদেশ একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।"
আইনি জটিলতা ও বিশ্লেষণ
অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশের ভিত্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে গণভোট আয়োজন করেছে, বৃহস্পতিবার সেই অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। এ অবস্থায় গণভোট প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া ছাড়াও বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে। কেউ কেউ এও বলছেন, অধ্যাদেশ বাতিল হলে পুরো গণভোট অবৈধ হয়ে যাবে। এদিকে ৩ মার্চ গণভোট এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ফলে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একধরনের আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ইস্যুতে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বৃহস্পতিবার বলেন, "গণভোট অধ্যাদেশটি বাতিলের জন্য সংসদীয় কমিটি সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। এখন অধ্যাদেশটি ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে উপস্থাপন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাবে।" তিনি বলেন, শুরুতেই অধ্যাদেশটি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কারণ, এতে এমন কিছু আছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না।
গণভোটের পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ
প্রসঙ্গত, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ওই আদেশের ওপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আদেশে বলা হয়, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন। সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই অধিবেশন ডাকা হয়নি।
এবারের নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। অর্থাৎ, ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটে আদেশটি অনুমোদিত হয়। তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা হলে কী হবে, তা আদেশে বলা নেই। এতে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি হয়তো আদালতের মাধ্যমে সুরাহা হতে হবে।
ব্যারিস্টার আহসানুল করিমের মতামত
ব্যারিস্টার আহসানুল করিম বলেন, "অধ্যাদেশটি বাতিলের সুপারিশের মানে হলো-এটি আর আইনে রূপ নেবে না। তবে গণভোট অধ্যাদেশটি আইনে রূপ না নিলেও গণভোট বাতিল হবে না। কারণ, ওই অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে গণভোট হয়ে গেছে। আর এটি আইনে রূপ নেওয়ার মানে হলো-ভবিষ্যতে এই আইনের মাধ্যমে মানুষের জন্য বাধ্যবাধকতা তৈরি করা। কিন্তু সেটির আর প্রয়োজন নেই।"
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, "সংস্কারকে ধামাচাপা দিয়ে সরকার সংবিধানে শুধু তাদের মনমতো কিছু সংশোধনী আনতে চায়। অথচ জুলাই সনদের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ রায় দিয়েছে। সেটা মানতে সবাই বাধ্য।" তিনি আরও বলেন, সরকার গণভোটের গণরায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে, যা জনগণকে অপমান করা এবং রক্তাক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থি।
সবকিছু মিলে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে-এমনটিই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। বিরোধী দলের রাজপথের আন্দোলন সরকারের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।



