মাদারীপুরে আধিপত্য বিরোধে হিংসাত্মক সংঘর্ষ: হাতবোমা বিস্ফোরণ ও ব্যাপক লুটপাট
মাদারীপুর জেলার সদর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার দুপুরে সদর উপজেলার মস্তফাপুর গোলচত্বর এলাকায় এ হিংসাত্মক ঘটনা সংঘটিত হয়, যেখানে অন্তত অর্ধশত হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাড়িঘর ও দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে।
ঘটনার পটভূমি ও উত্তেজনার সূত্রপাত
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মস্তফাপুর গোলচত্বর এলাকার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাবিব হাওলাদার ও ইদ্রিস হাওলাদারের সঙ্গে শামচু সরদার ওরফে কোপা শামচুর দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। সম্প্রতি একটি মারামারির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন শামচু। বৃহস্পতিবার বিকেলে মস্তফাপুর ইউনিয়নের ঢালীবাড়ি এলাকার আবিত ঢালী নামের এক যুবককে মারধর করেন শামচুর অনুসারীরা। এরপর সন্ধ্যায় ঢালীবাড়ি ও আমবাড়ি এলাকার লোকজন হক সরদারের নেতৃত্বে শামচু সরদারের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।
সংঘর্ষের বিস্তার ও হিংসার চিত্র
শুক্রবার সকালে ঢালী বংশের সঙ্গে হাবিব হাওলাদার ও ইদ্রিস হাওলাদারের লোকজন একত্র হয়ে শামচু সরদারের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। এ সময় উভয় পক্ষ নিজেদের আধিপত্য দেখাতে অন্তত অর্ধশত হাতবোমা নিক্ষেপ করে পুরো মস্তফাপুর গোলচত্বরে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে।
এ সময় শামচু সরদারের মামা আনসার খানের নেতৃত্বে মস্তফাপুর গোলচত্বরে থাকা শাহিদ হাওলাদারের মুঠোফোন ও ইলেকট্রনিকের দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পাশাপাশি, রাকিবুল ইসলামের বিরিয়ানির দোকান, হাবুল ও লাল চান ব্যাপারীর পুরির দোকান এবং আলাউদ্দিন হাওলাদারের মুদিদোকানেও একই রকম ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে মস্তফাপুর ইউনিয়নের আমবাড়ি এলাকার ইউসূফ ঢালীসহ ঢালীবাড়ির পাঁচটি বসতঘরেও ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ও ক্ষয়ক্ষতি
এ ঘটনায় ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কে প্রায় আধা ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল, যা দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী শাহিদ হাওলাদার জানান, তার দোকানের শাটার কুপিয়ে ভেঙে সব লুটপাট করে নেওয়া হয়েছে এবং তার ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো পক্ষের লোক নন, কিন্তু তার ব্যবসা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
বিরিয়ানির দোকানি রাকিবুল ইসলাম বলেন, তার দোকানে ভাঙচুর করে ৭০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তিনি এই অকারণ হামলায় হতবাক। প্রত্যক্ষদর্শী হারুণ মাতুব্বরের বর্ণনায়, হঠাৎ দুই পক্ষের উত্তেজনার মধ্যে বৃষ্টির মতো বোমা নিক্ষেপ শুরু হয় এবং অন্তত অর্ধশত বোমা বিস্ফোরণে চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
পুলিশি তৎপরতা ও আহতদের অবস্থা
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ছয়জন, যাদের মধ্যে কয়েকজনকে উদ্ধার করে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, মস্তফাপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সরদার ও হাওলাদার বংশের কোন্দল দীর্ঘদিনের, এবং নতুন করে ঢালীরা হাওলাদার বংশে যোগ দিয়ে শামচু সরদারের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে থানা–পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা, এবং এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই হিংসাত্মক ঘটনা স্থানীয় জনজীবনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে।



