মিয়ানমারের কোস্টগার্ডের হাতে আটক ১৬ জেলে, স্বজনদের উদ্বেগ ও সরকারি পদক্ষেপের প্রতীক্ষা
গত ২৩ মার্চ মহেশখালী উপকূল থেকে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের কোস্টগার্ড ১৬ জন জেলেকে আটক করে নিয়ে গেছে বলে পরিবারের সদস্যদের ধারণা। নিখোঁজের ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও উদ্ধারে কোনো অগ্রগতি নেই, যা স্বজনদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জেলেদের পরিচয় ও অপহরণের ঘটনা
অপহৃত জেলেদের মধ্যে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতির বাসিন্দা ১০ জন রয়েছেন। বাকি ছয়জন নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও ভোলা জেলার বাসিন্দা। লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে আছেন মো. জুয়েল, ফরহাদ হোসেন, মো. নীরব, মো. রাকিব হোসেন, সাদ্দাম হোসেন, মো. মেজবাহ উদ্দিন, মো. তাহমীদ, মো. তামজিদ, মো. লিটন ও মো. অজি উল্যাহ। এছাড়া নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মো. শাহজাহান, মো. সোহাগ ও জাবের হোসেন, চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর মো. কামাল হোসেন, মহেশখালীর তারেক রহমান এবং ভোলার দৌলতখানের মো. সাইমুনও আটক হয়েছেন।
জেলেদের স্বজনেরা জানান, গত ২৩ মার্চ সকালে একটি ট্রলারে করে ১৬ জন মাঝিমাল্লা ও জেলে বঙ্গোপসাগরের দিকে মাছ শিকারে যান। ২৮ মার্চ থেকে জেলেদের কয়েকজন পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানান, তাঁদের মিয়ানমারে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মিয়ানমারের কোস্টগার্ড বা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এই অপহরণ ঘটিয়েছে।
স্বজনদের দুর্ভোগ ও সরকারি পদক্ষেপ
রামগতির চর পোড়াগাছা জেলেপল্লিতে নিখোঁজ জেলে পরিবারের সদস্যরা উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। নিখোঁজ জেলেদের ওপর নির্ভরশীল প্রতিটি পরিবারে পাঁচ থেকে সাতজন সদস্য রয়েছেন। কয়েক দিন ধরে অনেক ঘরেই চুলা জ্বলেনি, এবং সামনের দিনগুলো নিয়ে তাঁরা গভীর দুর্ভাবনায় আছেন।
নিখোঁজ জেলে মো. অজি উল্যাহর ছোট ভাই জাকির হোসেন বলেন, “অভাব-অনটনের এই সংসারে বড় ভাই–ই ছিলেন একমাত্র ভরসা। তাঁর উপার্জনেই চলত পুরো পরিবার। ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে যেন সবকিছু থমকে গেছে—সংসারের চাকা আর ঘুরছে না।”
অপহৃত জেলেদের ট্রলারের মালিক কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কাললিয়াকাটা গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, গত ২৩ মার্চ সকালে তাঁর ট্রলারসহ ১৬ জন মাঝিমাল্লা ও জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁরা মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের উপকূলে মাছ শিকারে গিয়েছিলেন। এ নিয়ে তিনি মহেশখালী থানায় একটি জিডি করেন।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুস সুলতান মুঠোফোনে জানান, “জেলেদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, জেলেরা মিয়ানমারের কোস্টগার্ডের কাছে আটক রয়েছেন।”
ওসি মো. আবদুস সুলতান আরও উল্লেখ করেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে ইতিমধ্যে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাঁদের দ্রুত নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও মানবিক সংকট
নিখোঁজ জেলেদের স্বজনেরা জানান, গত ২৮ মার্চ জেলেদের সঙ্গে তাঁদের শেষবার মুঠোফোনে কথা হয়। তখন জেলেরা জানিয়েছিলেন, তাঁদের মিয়ানমারে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে তাঁরা চরম খাদ্যসংকট ও অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। এর পর থেকেই তাঁদের ব্যবহৃত মুঠোফোনগুলো বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, এবং কোনোভাবেই আর যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এই ঘটনায় জেলেদের পরিবারের সদস্যরা উদ্ধারে সরকারের জরুরি সহযোগিতা কামনা করেছেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জেলেদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হবে এবং এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন।



