ঈদের আগে চন্দ্রা ত্রিমোড়ে তীব্র যানজট: যাত্রীদের দুর্ভোগ
বছরের দুই ঈদের দুই দিন আগে থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এই যানজটের কবলে পড়ে উত্তরবঙ্গের ২১ জেলার হাজার হাজার যাত্রী ও চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। চন্দ্রা মোড়, যা উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত, সেখানে প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করে। তবে ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়ে যাওয়ায় মহাসড়কে দীর্ঘ যানবাহনের সারি তৈরি হচ্ছে, যার ফলে যাত্রীদের ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
যানজটের বিস্তারিত চিত্র
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকাল ৮টা পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজট লেগে ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মতে, সকাল ১০টা পর্যন্ত চাপ বেশি থাকলেও বেলা ১১টার পর থেকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। যাত্রী, চালক এবং স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মহাসড়কে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা সঠিকভাবে না মানার কারণে যানজটের তীব্রতা বেড়ে যায়।
যানজটের প্রধান কারণসমূহ
চন্দ্রা ত্রিমোড়ে যানজট লাগার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ দায়ী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ
- চন্দ্রা ত্রিমোড়কেন্দ্রিক অব্যবস্থাপনা
- কালিয়াকৈর অংশে সড়ক সংকুচিত হওয়া
- চন্দ্রা টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় গাড়ির অবৈধ পার্কিং
- যত্রতত্র সড়ক পারাপার ও ফিটনেস গাড়ির চলাচল
- অস্থায়ী বাজার ও অবৈধ অটোরিকশা চলাচল
- ফিটনেসবিহীন গাড়িতে যাত্রীদের যেখানে-সেখানে ওঠানামা
- পোশাক কারখানাগুলোর শ্রমিকরা একসঙ্গে বাড়ি যাওয়া
এছাড়া, চন্দ্রা ত্রিমোড় দিয়ে উত্তরবঙ্গের ২১ জেলার যানবাহন ছাড়াও চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক এবং স্থানীয় গাড়ির জটলায় এখানে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
বৃষ্টির প্রভাব ও যাত্রীদের অভিজ্ঞতা
বুধবার (১৮ মার্চ) বিকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি রাতভর চলতে থাকে। এই বৃষ্টিতে মহাসড়কের উঁচু-নিচু স্থানে পানি জমে যানবাহনের গতি কমে যায়, যা দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা, চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক ও চন্দ্রা-কোনাবাড়ী সড়কের বিভিন্ন অংশে সকালের দিকে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। চন্দ্রা থেকে নবীনগর সড়কের জিরানী বাজার পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকায় থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করেছে। রাতের যানজটের কবলে পড়ে অনেক যাত্রী গাড়িতে বসেই সকাল করে ফেলেন। ভোরে যারা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন, তাদের অনেকেই কোনাবাড়ী পার হতেই মৌচাক ও সফিপুর এলাকার কাছাকাছি গিয়ে যানজটের কবলে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীদের মতামত
রংপরের কাউনিয়া উপজেলা এলাকার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, "চন্দ্রা ত্রিমোড় তিনটি সড়কের মিলনস্থল। এখানে একযোগে যানবাহন মিলিত হওয়ায় এবং সব সময়ই যানবাহনের চাপ থাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।" চন্দ্রা এলাকার বাসিন্দা আবুল কালম যোগ করেন, "গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়া এলাকায় অসংখ্য শিল্পকারখানা রয়েছে। বছরের দুই ঈদে পোশাক শ্রমিক ছাড়াও ২১ জেলার হাজার হাজার মানুষকে চন্দ্রা মোড় হয়ে বাড়ি যেতে হয়, যা যানজট বাড়িয়ে দেয়।"
জামালপুরের জেলা সদরের মেহেদী হাসান বলেন, মহাসড়কের যেখানে সেখানে হঠাৎ বাস-ট্রাক দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা এবং ছোট যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও যানজটের অন্যতম কারণ। বাসচালক আব্দুল হক মিয়া উল্লেখ করেন, "চন্দ্রা উড়াল সড়কের পশ্চিম পাশে মহাসড়ক ছোট হয়ে গেছে, যা গাড়ির গতি কমিয়ে দেয় এবং দ্রুত যানজট তৈরি করে।"
সমাধানের উপায়
গাজীপুর সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, চন্দ্রা ত্রিমোড়ের যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর মধ্যে ত্রিমোড়ে উড়াল সড়কের পশ্চিম পাশে সড়ক প্রশস্ত করা, নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ড স্থাপন, যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ করা, এবং ধাপে ধাপে শিল্পকারখানাগুলো ছুটি ঘোষণা করা উচিত। গাজীপুরের পুলিশ সুপার শরিফ উদ্দীন বলেন, "ঈদের সময় হঠাৎ করেই যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় যানজট লেগে যায়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে প্রতি ঈদেই এখানে একই চিত্র দেখা যায়।"
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি রফিকুল হাসান গণি বলেন, "৩-৪ দিনের মধ্যে ৬০ লাখ মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলা সম্ভব নয়, আমাদের রাস্তাও বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই রাস্তাগুলো সঠিকভাবে ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে।" সামগ্রিকভাবে, চন্দ্রা ত্রিমোড়ের যানজট সমস্যা সমাধানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।



