মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: ইইউ, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত
মধ্যপ্রাচ্যে ইইউ, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত: ইউরোপীয় দেশগুলোর যুদ্ধে না জড়ানোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য ও জার্মানি নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরোক্ষ সামরিক চাপের মধ্যেও এই দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

যুক্তরাজ্য ও জার্মানির শান্তিপূর্ণ অবস্থান

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্যের বড় কোনো যুদ্ধে অংশ নেবে না। তিনি বলেন, 'যুক্তরাজ্যের প্রধান লক্ষ্য হলো নিজ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কোনো উসকানিতে পা দিয়ে ব্রিটেন বড় ধরনের যুদ্ধে নিজেকে যুক্ত করবে না।' এই বক্তব্য যুক্তরাজ্যের শান্তিপূর্ণ নীতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।

জার্মান সরকারও একই ধরনের অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো আইনি বা সামরিক সম্পর্ক নেই। জার্মানি কোনোভাবেই এই যুদ্ধে অংশ নেবে না এবং হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানেও অংশ নেবে না। গ্রিসও একই অবস্থান গ্রহণ করে নিশ্চিত করেছে যে হরমুজ প্রণালিতে তারা কোনো সামরিক অভিযানে যুক্ত হবে না।

ইইউ-এর কূটনৈতিক উদ্যোগ ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ

ইইউ-এর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা ক্যালাস হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে 'কৃষ্ণসাগর শস্য চুক্তি'র মতো একটি নতুন কূটনৈতিক মডেল প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ক্যালাস সতর্ক করে বলেছেন, 'হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে এশিয়ায় জ্বালানি সংকট এবং বিশ্বজুড়ে সার ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা পরবর্তী বছরগুলোতে খাদ্য সংকটের জন্ম দিতে পারে। প্রণালি বন্ধ হওয়া এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও সার উৎপাদনের জন্য বিপজ্জনক। যদি এই বছর সারের অভাব হয়, আগামী বছরও খাদ্য সংকট দেখা দেবে।'

ইইউ বর্তমানে তাদের সামুদ্রিক মিশন 'অ্যাসপিডিস'-এর পরিধি বাড়িয়ে হরমুজ প্রণালিতে নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চালাচ্ছে। মন্ত্রীরা ইইউর ছোট মধ্যপ্রাচ্য নৌ মিশন 'অ্যাসপিডিস'-এর ম্যান্ডেট পরিবর্তন করা সম্ভব কিনা তাও আলোচনা করবেন। এই মিশন বর্তমানে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে লোহিত সাগরে জাহাজগুলোকে রক্ষা করছে।

মানবিক সহায়তা ও পশ্চিমা দেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থান

পশ্চিমা দেশগুলোর এই সম্মিলিত অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা সামরিক সংঘাতের চেয়ে মানবিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানে বেশি আগ্রহী। এদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় রোধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৪৫ কোটি ৮০ লাখ ইউরো (প্রায় ৫২৫ মিলিয়ন ডলার) জরুরি সহায়তা ঘোষণা করেছে। ইইউ-এর মানবিক সংকট বিষয়ক কমিশনার হ্যাডজা লাহবিব বলেন, 'যখন অন্যরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।' এই অর্থ মূলত লেবানন ও ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক মানুষদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে বলে জানান তিনি।

ইউরোপীয় দেশগুলোর এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারা সামরিক সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক আলোচনা ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খুঁজছে, যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।