একজন বিজ্ঞানীকে বিচার করা হয় তাঁর গবেষণা দিয়ে, একজন শিক্ষককে তাঁর জ্ঞান দিয়ে, একজন রাজনীতিবিদকে তাঁর নীতি দিয়ে এবং একজন লেখককে তাঁর চিন্তা দিয়ে। কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে ইতিহাসে বারবার অন্য জিনিসও দেখা যায়। ১৯১১ সালে মেরি কুরি দ্বিতীয়বারের মতো নোবেল পুরস্কার পান। তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দুই ভিন্ন বৈজ্ঞানিক শাখায় নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। কিন্তু সেই সময় ইউরোপ তাঁর গবেষণা নিয়ে যতটা না ব্যস্ত ছিল, তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। ফরাসি বিজ্ঞানী পল লঁজ্যভাঁর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সংবাদপত্রে কুৎসা ছড়ানো হয়, ব্যক্তিগত চিঠি প্রকাশ করা হয়। এই আক্রমণগুলোর কোনোটিই মেরি কুরির গবেষণাকে ভুল প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু আক্রমণ নেমে এসেছিল অন্য জায়গায়—তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
চরিত্রহনন: জ্ঞানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কৌশল
মেরি কুরির ঘটনাটি ক্ষমতার একটি পুরোনো কৌশল উন্মোচন করে। যখন কোনো নারীর কাজকে অস্বীকার করা যায় না, তখন তাঁর চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। যখন তাঁর যুক্তির জবাব দেওয়া কঠিন হয়, তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। অর্থাৎ লক্ষ্য তাঁর চরিত্র নয়, লক্ষ্য তাঁর সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা।
মেরি কুরির ঘটনা এমন একটি আয়না, যেখানে ১১৫ বছর পরও আমরা নিজেদের দেখতে পাই। এখানে আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন আছে। আমরা কি সত্যিই একজন নারীর চরিত্র বিচার করি, নাকি তাঁর জ্ঞানকে অগ্রাহ্য করার জন্য চরিত্রকে অজুহাত বানাই?
আজও চলছে একই কৌশল
আজও যখন কোনো নারী রাজনীতিবিদ দৃঢ় অবস্থান নেন, তখন তাঁর রাজনীতির আগে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আলোচনায় আসে। একজন নারী বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক গবেষণাপত্র প্রকাশ করলে তাঁর গবেষণার আগে তাঁর ছবি নিয়ে মন্তব্য হয়। একজন নারী সাংবাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করলে প্রতিবেদনের বদলে তাঁর চরিত্র নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে।
যে সমাজ একজন নারীর জ্ঞানের চেয়ে তাঁর চরিত্রকে বড় করে দেখে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত সত্যকেও ‘প্রমাণ’ দিয়ে নয়, বরং গুজব দিয়ে বিচার করতে শেখে। কোনো সমাজ যখন একজন নারীর যুক্তির জবাবে তাঁর চরিত্র নিয়ে কথা বলে, তখন সে আসলে তাঁর জ্ঞানকে অকার্যকর করে দিতে চায়। এখানে চরিত্রহনন একটি নৈতিক সমস্যা থেকে রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়।
জ্ঞানগত অবিচার: দার্শনিক বিশ্লেষণ
দার্শনিক মিরান্ডা ফ্রিকার সম্ভবত এ কারণেই জ্ঞানগত অবিচারের কথা বলেছিলেন। কোনো মানুষের বক্তব্যকে তাঁর যুক্তির ভিত্তিতে নয়, বরং তাঁর পরিচয়ের ভিত্তিতে কম বিশ্বাসযোগ্য মনে করা—এটিই জ্ঞানগত অবিচার। আর যখন সেই পরিচয় নারী হওয়ার কারণে আরও বেশি সন্দেহের মুখে পড়ে, তখন চরিত্রহনন শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকে না, তা জ্ঞানের বিরুদ্ধেও আক্রমণে পরিণত হয়।
দার্শনিক হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, জনপরিসর সেই জায়গা, যেখানে মানুষ শুধু কথা বলে না, নাগরিক হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করে। সেই অর্থে জনপরিসরে কথা বলার অধিকার শুধু মতপ্রকাশের অধিকার নয়, এটি রাজনৈতিক অস্তিত্বেরও অধিকার। কিন্তু যদি কোনো নারী কথা বলার আগে জানেন যে তাঁর যুক্তির চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বেশি আলোচিত হবে, তাহলে সেই জনপরিসর আর সমান থাকে না। সেখানে আইনের চোখে সবাই সমান হলেও বাস্তবে সবার কণ্ঠের মূল্য সমান থাকে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশেও গত এক দশকে আমরা বারবার দেখেছি, নারী রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, শিল্পী, মানবাধিকারকর্মী কিংবা সামাজিক আন্দোলনের সংগঠকের বক্তব্যের জবাব প্রায়ই বক্তব্য দিয়ে দেওয়া হয় না। তার বদলে সামনে আনা হয় তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক পরিচয়, পোশাক, ছবি, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা চরিত্র নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ প্রবণতাকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছে।
একটি সম্পাদিত ছবি, একটি প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি কিংবা একটি গুজব কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। এ আক্রমণগুলোর উদ্দেশ্য সাধারণত কাউকে যুক্তি দিয়ে পরাজিত করা নয় বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তিনি কথা বলার আগেই সন্দেহের মুখে পড়েন। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্য শোনার আগেই তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় করা হয়। ফলে চরিত্রহননের লক্ষ্য চরিত্র নয়, লক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্যতা।
প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি
সমসাময়িক ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ান নারীবাদী তাত্ত্বিক সারা আহমেদ দেখিয়েছিলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান অন্যায়ের দিকে না তাকিয়ে বরং অন্যায়ের কথা যিনি বলেন, তাঁকেই সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে। আমাদের সমাজেও প্রায়ই একই দৃশ্য দেখা যায়। কোনো নারী বৈষম্য, দুর্নীতি, সহিংসতা বা অন্যায় নিয়ে কথা বললে তিনি যা বলেছেন, এর যৌক্তিকতা কতটুকু, তার চেয়ে তিনি কেমন মানুষ, সে প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ বাস্তবতাকে শুধু নারীবিদ্বেষ বলে ব্যাখ্যা করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ, এটা শুধু নারীর ক্ষতি নয়। যখন ব্যক্তিগত আক্রমণের ভয়ে কেউ নীরব হয়ে যান, তখন ধীরে ধীরে জনপরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। সমাজ ভিন্নমত হারায়, গবেষণা হারায়, সমালোচনামূলক চিন্তা হারায়। গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে টিকে থাকে না, টিকে থাকে এমন একটি পরিবেশে, যেখানে মানুষ ব্যক্তিগত অপমানের ভয় ছাড়াই যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে।
প্রযুক্তির নতুন মাত্রা
মেরি কুরির বিরুদ্ধে যে কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল, তার ভাষা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু যুক্তি খুব বেশি বদলায়নি। তখন সংবাদপত্র ছিল চরিত্রহননের প্রধান মাধ্যম, আজ সেই জায়গায় এসেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। তখন ব্যক্তিগত চিঠি ফাঁস করা হতো, আজ সম্পাদিত ছবি, ভুয়া উদ্ধৃতি বা বিভ্রান্তিকর তথ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে।
যে সমাজ একজন নারীর জ্ঞানের চেয়ে তাঁর চরিত্রকে বড় করে দেখে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত সত্যকেও ‘প্রমাণ’ দিয়ে নয়, বরং গুজব দিয়ে বিচার করতে শেখে। কোনো সমাজ যখন একজন নারীর যুক্তির জবাবে তাঁর চরিত্র নিয়ে কথা বলে, তখন সে আসলে তাঁর জ্ঞানকে অকার্যকর করে দিতে চায়। এখানে চরিত্রহনন একটি নৈতিক সমস্যা থেকে রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়।
● স্নিগ্ধা রেজওয়ানা অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



