বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘স্লিপ অব টাং’ বা মুখ ফসকে বলার প্রবণতা যেন রাজনীতির অংশ হয়ে যাচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছে জামায়াতে ইসলামী। দেখা যায়, বক্তব্য দেওয়ার পর যখন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা ওঠে এবং বক্তব্যটি মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়, তখনই বক্তারা মুখ ফসকে বলার দোহাই দিয়ে থাকেন এবং সেটিকে হালকা করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এগুলো তাদের ক্ষেত্রে বারবার ঘটছে।
আব্দুল মুনতাকিমের বক্তব্য ও বিতর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিমের একটি বক্তব্য গত ১৪ জুন সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা-চাচা) সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাইযোদ্ধা।’
এর পরপরই তার এই বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় ওঠে। প্রশ্ন ওঠে, জন্ম সনদ অনুযায়ী মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে, তাহলে ওনার বাবা কীভাবে ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বলে তিনি দাবি করতে পারেন? পরে জানা গেল, ওনার বাবা জীবিত আছেন। ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি বক্তব্যটি সংশোধন করে জানান, এটি ছিল ‘স্লিপ অব টাং’ বা মুখের ভুল। তিনি বলেন, ‘আসলে আমি আমার বাবার চাচার কথা বলতে চেয়েছিলাম।’
মুফতি হামজার বক্তব্য ও স্লিপ অব টাং
কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি হামজাও একের পর এক স্লিপ অব টাং করেই যাচ্ছেন। জাতীয় বাজেট নিয়ে বক্তব্যে তিনি বলেন, বাজেটের আকার ৬০০ কোটি টাকা। পরে আবারও সমালোচনার মুখে তিনি বলেন, ‘ছয়শো কোটি নয়, ৬ লাখ কোটি টাকা বোঝাতে চেয়েছি।’ এর আগেও তিনি বেশ কয়েকবার এই ধরনের, তার ভাষায় স্লিপ অব টাং করেছেন।
বাংলাদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তার বক্তব্য আগেও নানা ধরনের সমালোচনা তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি বলেছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে ১৬ বছর আজান দিতে দেয়নি জালেমরা। ছাত্রলীগের ভাইদের ঘুমের ডিস্টার্ব হবে বলে ফজরের আজান দিতে দিতো না। এবার ডাকসুতে শিবির প্যানেল জয়ী হওয়ার পর পরদিনই আজান আরম্ভ হয়েছে, আল্লাহু আকবার।’ পরে সেই হলের মুয়াজ্জিন এবং শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ জানালে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুহসিন হলে আজান দেওয়া নিয়ে আমার বক্তব্যের সমালোচনা হচ্ছে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নাম বলতে গিয়ে মুহসিন হলের নাম বলে ফেলেছি। এটি ইচ্ছে করে বলিনি। মুখ ফসকে হয়ে গেছে। আমি এ জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। মহসিন হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জামানায় অনেক জুলুম অত্যাচার হয়েছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্ক
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও মনগড়া মন্তব্য করেছিলেন আমির হামজা। তিনি নিজেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী দাবি করে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের ‘মদ দিয়ে কুলি করতে দেখেছেন এবং ছাত্ররা শিক্ষকদের লাঠি দিয়ে পেটায়।’ তবে তার এসব বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১১ সালে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ চালু হয়। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে এই বিভাগে প্রথম শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। সুতরাং, আমির হামজা জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হওয়ার যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা সত্য নয়। আবাসিক হলগুলোতে সকালে ‘মদ’ দিয়ে কুলি করার প্রত্যক্ষ করার বর্ণনাটিও তার মনগড়া ও অসত্য।’ এই বক্তব্যের পরও তিনি ক্ষমা চেয়েছেন।
সংসদে বক্তব্য ও স্পিকারের আপত্তি
স্লিপ অব টাং এর পাশাপাশি সংসদে জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্যের ‘ভাষা’ নিয়ে স্পিকার আপত্তি তোলেন। যেমন, নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুস সাত্তারের একটি উপমাও সংসদে বিতর্ক তৈরি করে। তার বক্তব্যের ‘আপত্তিকর’ অংশ স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এসব নিয়ে ‘হাসাহাসি’ হয়েছে, প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— জামায়াত নেতারা এই স্লিপ অব টাংগুলো কেন করছেন?
রাজনৈতিক কৌশল নাকি ভুল?
অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন স্লিপ অব টাং একটি ‘নিরীহ’ বিষয়। যে কারোরই এটা হতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন, কোন কোন বিষয় নিয়ে তারা ‘স্লিপ অব টাং’ করছে এবং কখন এসে এগুলোকে ‘স্লিপ অব টাং’ বলে ক্ষমা চাচ্ছে। আমির হামজা এখন সংসদ সদস্য। নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তিনি একের পর এক বানোয়াট কথা বলেছেন। এবং এইসব ক্ষেত্রে তিনি ধর্মের সংবেদনশীল উপাদানকে ব্যবহার করেছেন। কারণ তিনি জানেন, এগুলো ব্যবহার করে ধর্মপ্রাণ লোকজনকে উত্তেজিত করা যায়। কিন্তু তিনি ভাবেননি হয়তো, এগুলো নিয়ে প্রতিবাদ হবে। কারণ সাধারণত কেউ ‘মুখ ফসকে’ ভুল বললে, তখনই তা শুধরে নেয়। কিন্তু তিনি তা করেননি; বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় ওঠা এবং বক্তব্যগুলো অসত্য প্রমাণিত হওয়ায় নিজেকে এবং দলকে বাঁচাতে তখন বলছেন ‘স্লিপ অব টাং’ হয়েছে।
ঠিক একইভাবে আব্দুল মুনতাকিমের ক্ষেত্রেও বলা যায়। তার বক্তব্যও রাজনৈতিক। কারণ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি বড় বৈরিতা রয়েছে। ইতিহাসের জ্বলজ্বলে সত্য হলো— জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীই নয়, বরং পাকিস্তানিদের নির্যাতনের অন্যতম সহযোগী। কিন্তু বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাদের একটি ‘সখ্যতা’র বায়বীয় ভিত্তি জনগণকে জানাতে চায়। যার কারণে জামায়াতে ইসলামীতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন এবং এবারের সংসদেও দু’জন মুক্তিযোদ্ধা জামায়াতের সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন, এগুলোকে সামনে আনছে জামায়াত।
তারই ধারাবাহিকতায় মুনতাকিমের এই পদক্ষেপ মনে হচ্ছে। বলার পরও সংসদ সদস্য মুনতাকিমের মনে হয়নি যে, তিনি অসত্য তথ্য দিচ্ছেন। পরে যখন তার বক্তব্য ঘিরে সমালোচনা শুরু হলো, তখনই তিনি তার সহযোগীদের পথ ধরে বললেন, ‘এটা স্লিপ অব টাং’।
আমির হামজা এবং মুনতাকিম দুইজনেই সংসদ সদস্য। তারা যখন এই ধরনের অসত্য তথ্য দেন এবং পরে সেগুলো অসত্য বলে প্রমাণিত হলে, চাপে পড়ে সেগুলোকে ‘স্লিপ অব টাং’ বলে হালকা করার চেষ্টা করেন, তখন স্পষ্টই বোঝা যায় যে, এটি আসলে তাদের রাজনৈতিক কৌশল। কৌশলটি হলো, ধরা না পড়লে এই ‘অসত্য’ই পরে ‘সত্য’ হয়ে যাবে। ধরা পড়লে সেটি ‘মুখ ফসকে’ বলা হবে। আর তা না হলে ধরেই নেওয়া হবে যে, মুখ ফসকানো বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কৌশল হিসেবেই কি স্থায়ী হচ্ছে?
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



