জাতীয় সংসদে বিএনপির এক সদস্যের বক্তব্য, স্পিকারের মন্তব্য, বিরোধী দলের প্রতিবাদ এবং পরে সেই বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আমির মাওলানা মামুনুল হক। সংসদে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিতর্কিত আলোচনা, তা ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও রাজধানীতে বিক্ষোভের পর প্রশ্ন উঠেছে— হঠাৎ জাতীয় সংসদের আলোচনায় কেন মামুনুল হক?
সংসদে মামুনুল হক প্রসঙ্গ: বক্তব্য ও বিতর্ক
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আমির মাওলানা মামুনুল হকের প্রসঙ্গ টানেন বিএনপির সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক। তিনি বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হক অনেক বড় বড় কথা বলছেন। বাজেট নিয়ে তিনি সরকারের পতন ঘটাবেন, অনেক কিছু ঘটাবেন। কিন্তু তিনি যে গাজীপুরে নারীসহ ধরা পড়লেন মুতা বিয়ের নামে, সেটা আসলে কী ছিল, আমি জানি না।’ এ সময় তিনি স্পিকারের কাছে মুতা বিয়ে কী, সে সম্পর্কেও জানতে চান।
আবু আশফাকের বক্তব্য শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অপ্রাসঙ্গিক কোনও বিষয় বক্তব্যে না আনাই ভালো। একজন রাজনৈতিক নেতার পরকীয়া সম্পর্কে আপনি মন্তব্য করেছেন। সাধারণত যার এখানে এসে জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে অভিযোগ তোলা সংসদে সমীচীন নয়।’ খোন্দকার আবু আশফাকের উদ্দেশে স্পিকার আরও বলেন, ‘মুতা বিয়ে সম্পর্কে আমার কাছে কেন জানতে চাইলেন? আমাকে এসবের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মনে হয়?’ তবে মুতা বিয়ে প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, ‘মুতা বিয়ে হলো, সম্ভবত কেউ বিদেশে গেলে, আগের কালে নিয়ম ছিল সাময়িক, এক মাসের জন্য ‘সো কল্ড’ বিয়ে করতে পারতেন বা একজন সঙ্গী খুঁজে নিতে পারতেন। এগুলো নিয়ে সংসদে আলাপ-আলোচনা না করা ভালো।’
বিরোধী দলের প্রতিবাদ ও বক্তব্য বাদ
মামুনুল হকের বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিএনপির ওই সংসদ সদস্যের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হয়। পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বিএনপির ওই সদস্যের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘মুতা বিয়ের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞ না, তবে কনসেপ্টের বিষয়ে আমি জানি। মামুনুল হক সাহেবের বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, এটা একেবারেই ভুল তথ্য। উনি মুতা বিয়ে করেন নাই। গাজীপুরে এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটে নাই। তাকে হেনস্তা করা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে। উনি বিয়ে করেছিলেন, এটা স্টাবলিশড। বিয়ে করা জায়েজ।’
পরে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলামও অসংসদীয় বিষয় কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করেন। একি বিষয় নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মুজিবুর রহমানও আলোচনা করেছিলেন।
পরবর্তীকালে মামুনুল হককে নিয়ে সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্যের বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ (কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া) করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক, চাই না আমরা।’
রাজধানীতে বিক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া
জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কটুক্তি ও অবিবেচক কথাবার্তা বলেছেন বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস। স্পিকারের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে গত শুক্রবার (১৯ জুন) রাজধানীর বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে এক বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলও করে সংগঠনটি।
বিক্ষোভ সমাবেশ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, ভবিষ্যতে যারা ফ্যাসিবাদের রাজনীতি করবে, তাদের পরিণতিও ফ্যাসিবাদীদের মতোই হবে। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে সংসদে একজন জনপ্রিয় আলেম ও বিরোধী মতের নেতাকে আক্রমণ করা বিগত ফ্যাসিবাদী আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। একটি মীমাংসিত বিষয়ে আদালতের রায়কে উপেক্ষা করে যে অশালীন মন্তব্য করা হয়েছে, তার জন্য স্পিকারকে অবশ্যই জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।’
বিক্ষোভে সমাবেশে বিএনপির সংসদ সদস্য আবু আশফাকের অশালীন বক্তব্যের জন্য আদালত অবমাননা ও মানহানি মামলায় গ্রেফতার করে জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি মাওলানা রাকিবুল ইসলাম।
এমপিদের প্রতিক্রিয়া ও বক্তব্য
মামুনুল হকের বিষয়টি সংসদে উত্থাপনের পর খোদ প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি শাহাদাত হোসেন সেলিম। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়টি নিয়ে আসলে সংসদে উপস্থিত অনেকেই, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। পরবর্তী সময়ে তো বিষয়টি স্পিকার এক্সপাঞ্জ (কার্য্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া) করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আসলে সংসদে যিনি উপস্থিত নেই, তার সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা যায় না। সংসদে অনেকে তো নতুন, সেজন্য ঠিকমতো কার্যবিধি জানেন না। আমার মনে হয়, এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করা উচিত হবে না।’
সংসদে কারও ক্যারেক্টার নিয়ে আলোচনা করা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা ১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘প্রথমত সংসদে এসব আলোচনা করা ঠিক না। সংসদে যে লোক নাই বা যার ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ নাই, তাকে নিয়ে আলোচনা করা যায় না, এটা স্পিকারও বলেছিলেন। দ্বিতীয়ত, মুতা বিবাহ কিন্তু ইসলামে এখন নিষিদ্ধ। আর ঘটনা ঘটেছে সোনারগাঁওয়ে, উনি বলেছেন গাজীপুর।’
জামায়াতের এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘আসলে এই ঘটনাটা ঘটিয়েছে তো শেখ হাসিনা। এ নিয়ে ওনাকে (মামুনুল হক) দীর্ঘ সময় জেলে জুলুম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। সে সময় তো একটা কঠিন সময় ছিল। বিরোধীদের দমন করার জন্য এমন কোনও পন্থা নেই, যা সরকার অবলম্বন করেনি। সেসময় বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের চরিত্র হননের জন্য সরকার অনেক ঘৃণ্য কাজ করেছে। মামুনুল হকের এবিষয় নিয়ে সংসদে কোনোভাবেই আলোচনা করা উচিত হয়নি।’



