ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিএনপি এগিয়ে, জামায়াতের চ্যালেঞ্জ
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এগিয়ে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: গোয়েন্দা জরিপে বিএনপির এগিয়ে থাকার তথ্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ও সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নিরাপত্তা ছক প্রণয়নের উদ্দেশ্যে এসব জরিপ চালিয়েছে। মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা এবং যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যই এসব জরিপ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব জরিপের ফলাফল সাধারণত প্রকাশ করা না হলেও একটি গোয়েন্দা সংস্থার জরিপ প্রতিবেদনের কপি বিডি গেজেটের হাতে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বেশ কিছু আসনে এগিয়ে আছে। যদিও বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে, তবুও বেশ কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়লাভ করতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন জেলার আসনভিত্তিক সম্ভাব্য ফলাফল

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে বিএনপির শক্ত অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার নওশেদ জামির জয়লাভ করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পঞ্চগড়-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী ফরহাদ হোসেন আজাদের জয়লাভের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তার সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থী সফিউল আলমের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জয়লাভ করবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল হাকিমের জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাধ্যমে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জাহিদুর রহমান জাহিদ জয়লাভ করতে পারেন।

দিনাজপুরের ছয়টি আসনের মধ্যে চারটি আসনেই বিএনপি জয়লাভ করবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে দিনাজপুর-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি। দিনাজপুর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী (বিএনপির বিদ্রোহী) এ কেএম কামরুজ্জামান বিজয়ী হতে পারেন।

অন্যান্য অঞ্চলের চিত্র

নীলফামারীর চারটি আসনের মধ্যে একটি করে আসনে বিএনপি ও জামায়াত নিশ্চিত জয় পেতে পারে। একটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, অপর আসনটিতে ত্রিমুখী লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াত ও জাতীয় পার্টির মধ্যে। লালমনিরহাটের তিনটি আসনের মধ্যে দুইটি বিএনপির পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, একটিতে জামায়াত ও বিএনপির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।

রংপুরের ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটি বিএনপি, দুইটি জামায়াত ও একটিতে জাতীয় পার্টির জয়লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। কুড়িগ্রামের চারটি আসনের মধ্যে বিএনপির তিনটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, অপর আসনে (কুড়িগ্রাম-১) বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও হাত পাখার মধ্যে চতুর্মুখী লড়াই হবে।

গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের মধ্যে দুইটি করে আসন বিএনপি ও জামায়াত পেতে পারেন। একটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেন। জয়পুরহাটের একটি আসনে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে, অপরটিতে বিএনপির প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি।

মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের অবস্থা

বগুড়ার সাতটি আসনের মধ্যে ছয়টিতেই বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা আছে, আর একটিতে (বগুড়া-৩) বিএনপি এবং জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। চাপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনের মধ্যে একটিতে বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি, অন্য দুইটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।

নওগাঁর ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিই বিএনপি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, দুইটিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র লড়াই হবে। রাজশাহী জেলার ছয়টি আসনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। নাটোরের চারটি আসনের মধ্যে একটি করে আসন জিততে পারেন জামায়াত, বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী, অপরটিতে বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে তুমুল লড়াই হবে।

সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনের মধ্যে চারটি আসনে বিএনপির জয়লাভের সুযোগ বেশি, আর দুইটি আসনে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। পাবনার পাঁচটি আসনের মধ্যে দুইটিতে বিএনপি ও দুইটিতে জামায়াত জয়লাভ করতে পারেন, একটিতে বিএনপির দলীয় এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে।

খুলনা ও বরিশাল বিভাগ

খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতেই বিএনপি এগিয়ে আছে, দুইটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সাতক্ষীরার চারটি আসনের মধ্যে দুইটিতে জামায়াত জয়লাভ করতে পারে, একটিতে বিএনপি এবং অপরটিতে বিএনপি বা জামায়াতের যে কেউ জয়লাভ করতে পারেন।

বরগুনার একটিতে বিএনপি এবং অপরটিতে বিএনপি বা জামায়াতের যে কেউ জয়লাভ করতে পারেন। পটুয়াখালীর দুইটি আসনে বিএনপি, একটি আসনে বিএনপি অথবা জামায়াত এবং অপরটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেন। ভোলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটি বিএনপি এবং একটি বিএনপি সমর্থিত অথবা জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেন।

বরিশালের ছয়টি এবং ঝালকাঠির দুইটি আসনই বিএনপির জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। পিরোজপুরের একটি আসনে জামায়াত, একটিতে বিএনপি এবং অপরটিতে বিএনপি সমর্থিত বা ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের (হাতপাখা) প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেন।

ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা

টাঙ্গাইলের আটটি আসনের মধ্যে পাঁচটিই বিএনপি পাবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাকি তিনটি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেতে পারেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীও আছেন। জামালপুরের পাঁচটি আসনের সব কয়টিতেই বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেরপুরের একটি আসন বিএনপি এবং অপরটি বিএনপি অথবা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ময়মনসিংহের ১১টি আসনের মধ্যে চারটি আসন বিএনপির মোটামুটি নিশ্চিত, অন্য আসনগুলো বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বা জামায়াতে ইসলামী পেতে পারেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৫টিতেই বিএনপি বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি করে আসন পাবে জামায়াত ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। দুইটিতে বিএনপি-জামায়াতের এবং একটিতে বিএনপি-খেলাফত মজলিশের তীব্র লড়াই হবে। গাজীপুর এবং নরসিংদীর পাঁচটি করে আসনেই বিএনপি জয়লাভের সম্ভাবনা আছে।

নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি বিজয়ী হতে পারেন, একটিতে বিএনপি অথবা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সুযোগ আছে, অপরটিতে ত্রিমুখী লড়াই হবে। রাজবাড়ীর দুইটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে বিএনপির। ফরিদপুরের তিনটি আসন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এবং একটি আসন জামায়াত অথবা বিএনপি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ

সিলেট জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা, আর দুইটিতে জামায়াত অথবা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেন। মৌলভীবাজারের দুইটি আসনে বিএনপি জয়লাভের সম্ভাবনা বেশি, একটি বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপির তীব্র প্রতিযোগিতা ও অন্যটিতে ত্রিমুখী লড়াই হবে।

হবিগঞ্জের চারটি আসনে বিএনপির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগের আসনগুলোর মধ্যে ৩৫টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা বিএনপির, অপরদিকে তিনটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা জামায়াতের। অন্য আসনগুলোর জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে বিএনপি, জামায়াত, বিএনপির বিদ্রোহী বা অন্যান্য প্রার্থীর লড়াইয়ের মাধ্যমে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের এই তথ্যগুলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এই অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।