নগরায়ণে মায়ের একাকীত্ব: রবীন্দ্রনাথের ‘অন্য মা’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা
নগরায়ণে মায়ের একাকীত্ব: রবীন্দ্রনাথের ‘অন্য মা’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অন্য মা’ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অন্য মা’ কবিতা পড়লে বিশ্বের সব মাকেই আপন লাগে। ‘আমার মা না হয়ে তুমি/ আর কারো মা হলে/ ভাবছ তোমায় চিনতেম না,/ যেতেম না ঐ কোলে?/ মজা আরো হত ভারি,/ দুই জায়গায় থাকত বাড়ি,/ আমি থাকতেম এই গাঁয়েতে,/ তুমি পারের গাঁয়ে...।’ সেই ছায়াঘেরা গ্রামের উঠোন, হরেক পাখির ডাক ছাপিয়ে মায়েদের গল্প এখন নাগরিক কংক্রিটের নির্মমতায় ঠাঁয় নিয়েছে।

নগরায়ণ ও বিশ্বায়নের প্রভাব

নগরায়ণ আর বিশ্বায়নের সুনামিতে সন্তানরা আজ মায়ের কোল ছেড়ে উড়াল দেয় দূর কোনো দেশে। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে। পেছনে থাকে মায়ের ঝাপসা চোখ। চেনা গ্রামে কিংবা মফস্বলের শূন্য বাড়িতে নিঃসঙ্গতায়। উঠোনের অদূরে বাবা কিংবা স্বামীর কবরের পাশে শীতল ছায়ায়। একাকী ঘরে নিঝুম রাতে মায়েরা শুনতে পায় সন্তানের প্রশ্ন, ‘মা গো! আমায় বলতে পারিস কোথায়/ ছিলাম আমি-/ কোন্ না-জানা দেশ থেকে তোর/ কোলে এলাম নামি?’ ঘুম ভেঙে সেই উত্তর দেওয়া আর হয় না নাড়িছেঁড়া খোকাকে।

মায়ের একাকীত্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মায়ের এই একাকীত্ব শুধু ব্যক্তির নয়, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতার নির্মমতার সাক্ষী। অথচ আদিম যুগেও মায়েরা ছিলেন বিশ্বজনীন শক্তির এক রূপ। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘ভেনাস’ মাতৃত্বের শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। মেসোপটেমিয়ায় নিনহুরসাগ অর্থ ‘পাহাড়ের মহিলা’। তিনি দেবতাদের মাতা ও মানব সৃষ্টির প্রধান রূপকার। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে শুরু করে মিশর, গ্রিস ও চীনের প্রাচীন পুরাণগুলো মাতৃত্বের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য প্রকাশ করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাতৃত্বের বিভিন্ন রূপ

হিন্দু ধর্মে দুর্গা ও কালী মাতৃত্বের কোমল রূপের পাশাপাশি ধ্বংসাত্মক, মিশরের আইসিস আদর্শ মা ও পত্নী, গ্রিসের দিমিতের ও কোরি মাতা-কন্যার এক অনন্য রূপকথা। মা শুধু দেবী হিসেবেই নন, লোককথার চরিত্র হিসেবেও বিরাজমান। ‘মা’ শব্দভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মুখে উচ্চারিত প্রথম অর্থপূর্ণ ধ্বনি সম্ভবত ‘মা’। বুকের দুধ পান করার সময় শিশুর ঠোঁটের অনুকরণে গঠিত ধ্বনিটি পৃথিবীর প্রায় সব ভাষায় ‘মা’ শব্দের জন্ম দিয়েছে। বাংলায় আমরা বলি ‘মা’, ইংরেজিতে ‘মাদার’, ল্যাটিনে ‘মেটার’, গ্রিক ‘ম্যাটার’ ধ্বনিগুলো প্রায় একই। কারণ শিশুর প্রথম উচ্চারণযোগ্য ধ্বনি হলো ‘মা’ বা ‘আম্মা’। তবে শুধু মানুষ নয়, প্রাচীন সুমেরীয় পুরাণে মাতৃদেবী ‘মামা’ নামে পরিচিত ছিলেন। প্রমাণ মিলছে ‘মা’ ধ্বনিটি আগে থেকেই দেবীমূর্তিতে রূপ পেয়েছিল।

নগরায়ণে মায়েরা

শিল্প বিপ্লবের পর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বাংলার চিরায়ত পারিবারিক কাঠামোতে আঘাত হানে। কাজ আর ‘উন্নত জীবনের’ খোঁজে ঘর ছাড়তে শুরু করে মানুষ। প্রথমে গ্রাম, তারপর শহর ছেড়ে দূর দেশে পাড়ি জমাতে থাকে। সেই নগরায়ণের ফলেই প্রথম ভাঙতে শুরু করে যৌথ পরিবার। কংক্রিটের পাঁজরে গড়ে উঠতে থাকে নিঃসঙ্গ একক পরিবার। যে ভাঙনের প্রথম আর প্রধান শিকার হন মায়েরা। সন্তানরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় মায়েদের নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ার ঘটনাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন ‘এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম’।

যে সন্তানকে কেন্দ্র করে মায়ের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আবর্তিত হতো, সেই সন্তান হঠাৎ দূরে চলে যাওয়ায় মায়েরা তীব্র মানসিক শূন্যতা ও অবসাদে ভোগেন। ঘরভর্তি ফ্রিজ, টিভি, এসি বা সোফা আছে; কিন্তু কথা বলার কেউ নেই। একসময় গ্রামের প্রতিবেশীরা একে অপরের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হতো। তবে শহুরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির ছোঁয়া সেই কাঠামোও ভেঙে দিচ্ছে। পাশের বাড়ির কেউ আর ডাক দিয়ে দেখতে আসেন না। কেউ জানেন না, দিনের পর দিন মায়ের কেমন কাটছে, ওষুধ ঠিকমতো খাওয়া হচ্ছে কিনা।

রাষ্ট্রের অবহেলা

বিশ্বের কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোর মূল ধারণা নাগরিকের শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। উন্নত বিশ্বে প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বলয় ও যত্নের ব্যবস্থা থাকে। দূরগামী কোনো সন্তানের দিকে চেয়ে থাকতে হয় না। অথচ, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে একাকী মায়েদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক বা শারীরিক সেবার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই বললেই চলে। অতি আধুনিকতা আমাদের উজাড় করে দিয়েছে লোভনীয় ব্যক্তিস্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি আর আকাশছোঁয়া ক্যারিয়ার। বিপরীতে কেড়ে নিয়েছে আত্মিক টান। তাই মানবিকতার চেয়ে এখন ‘সময়ই অর্থ’। এই ইঁদুরদৌড়ে সন্তানরা এতটাই যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে যে, মায়ের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনার সময়টুকুও তাদের নেই।

মা সন্তানের ক্যারিয়ারের কথা ভেবে নিজের কষ্ট গোপন করেন। ফোনে হাসিমুখে বলেন, ‘আমি ভালো আছি বাবা, তুই নিজের খেয়াল রাখিস।’ এই ‘ভালো থাকার’ আড়ালে যে কত গভীর একাকীত্ব লুকিয়ে থাকে, তা আধুনিকতার চাকচিক্য দিয়ে ঢাকা যায় না। মিরপুরে যুগ্ম-সচিবের মায়ের পচন ধরা লাশ যার বড় প্রমাণ। ছেলে এলিট পদে, আর মায়ের ঘর আবর্জনার স্তূপে। মা কখন মারা গেলেন, কেউ জানে না।

প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা

৫জি ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকের ভিডিও কল যোগাযোগকে চোখের পলকের ব্যাপার করেছে। সাত সমুদ্র পারের সন্তানকেও আজ স্ক্রিনে ‘জীবন্ত’ দেখা যায়। তবে সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব বলছে, প্রযুক্তি ‘যোগাযোগের বিভ্রম’ তৈরি করছে। ভিডিও কলে মায়ের মুখের অবয়ব দেখা যায়, কিন্তু তার কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপা যায় না। প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্তান টাকা পাঠাতে পারে, কিন্তু একাকীত্বের দীর্ঘ রাতে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার স্পর্শ প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারেনি। ডিজিটাল স্ক্রিনের এই কৃত্রিম আলো মায়ের ভেতরের অন্ধকারকে আরো বেশি স্পষ্ট করে তোলে। একটি ‘লাইক’ আর ‘কমেন্ট’ মায়ের কষ্ট লাঘব করে না।

আইনি ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা

‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩’ থাকলেও প্রয়োগ নেই বললেই চলে। মা স্বভাবতই সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারেন না। আর সন্তানেরা মনে করেন, মায়ের দেখাশোনা তো আইনের চোখে অপরাধ নয়! রাষ্ট্র যখন নাগরিকের মৌলিক ও মানসিক সুরক্ষার দায়িত্ব পরিবারের ওপর ছেড়ে দেয়, আর পরিবার যখন নগরায়ণের চাপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন মায়েরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। কংক্রিটের নগরায়ণ বহুতল ভবন ও রেমিট্যান্সের পাহাড় দিয়েছে। অথচ তা কোল খালি করেছে মায়েদের। মধ্যরাতে হঠাৎ স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো একটি হাতও পাশে থাকে না।