গুলশান-বনানীর আভিজাত্য বনাম হকার অর্থনীতি: দ্বন্দ্ব ও বাস্তবতা
গুলশান-বনানীর আভিজাত্য বনাম হকার অর্থনীতি: দ্বন্দ্ব

‘গুলশান বনানী’—প্রায়শই প্রচলিত আলাপচারিতায় এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। এটি দিয়ে ঢাকার বিশেষ কিছু অভিজাত এলাকাকে বোঝানো হয়, যেখানে কেবল উচ্চবিত্তরাই বাসা ভাড়া বহন করতে পারে। সেখানে পরিপাটি পার্ক, নিরিবিলি পরিবেশ, বিনোদনের স্থান এবং উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ডের সহজলভ্যতা রয়েছে। গুলশান বা বনানীতে বাস করার একটি আভিজাত্য আছে, যা বাড্ডা, বসিলা, রামপুরা বা বনশ্রীতে নেই বলেই শব্দবন্ধটির এত প্রচলন।

অভিজাত নগরীর ধারণা ও তার সমালোচনা

সমাজবিজ্ঞানী অমিতা ভাস্করের ‘দি পলিটিক্স অব সিটি’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে প্রচলিত ধারার পরিবেশবিদ এবং নগরবিদরা মনে করেন শহর হওয়া উচিত অভিজাত ও উচ্চবিত্তের বাণিজ্য ও উপভোগের কেন্দ্র। তাই তারা বস্তি উচ্ছেদ করেও পার্ক ও শপিং মল তৈরি করার প্রস্তাব দেন। ২০২৪ সালে ঢাকার মিরনজিল্লায় শত শত হরিজন পরিবার উচ্ছেদ করে মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা এই চিন্তার ধারাবাহিকতা।

একই লেখায় অমিতা ভাস্কর দিল্লি শহরের ১৯৯৫ সালের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সেখানে দিলীপ নামে ১৮ বছরের এক দরিদ্র, কাদামাখা স্বল্প কাপড়ের ছেলে ভারতের রাষ্ট্রীয় কুচকাওয়াজের প্যারেড দেখতে এসে অভিজাতদের পার্কে ঢুকে একদল উচ্চবিত্তের হাতে বেদম মার খেয়ে মারা যায়। ওই পার্কটি দিল্লির একদল বাসিন্দার কাছে ছিল তাদের রুচিশীল নগর জীবনের প্রতীক, আর অন্য দল বাসিন্দার কাছে তা ছিল শৌচাগার হিসেবে ব্যবহারের জন্য একমাত্র উপলব্ধ স্থান। দিলীপকে উচ্চবিত্ত হামলাকারীরা দ্বিতীয় দলের বাসিন্দা মনে করেই পিটিয়ে হত্যা করে। বড়লোকি নান্দনিক শহরের আকাঙ্ক্ষা বনাম শ্রমজীবী কিংবা ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর শহরকেন্দ্রিক বাস্তবতার দ্বন্দ্বে তাকে সেদিন মরে যেতে হয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঢাকায় হকার উচ্ছেদের রাজনীতি

সম্প্রতি সোহানী শিফা নামে একজন নারী যখন একা শাহবাগে দাঁড়িয়ে ‘ঢাকা বাঁচাও, হকার হটাও’ আন্দোলন করেন, আমি দিল্লির ওই রুচিসমেত আভিজাত্যের বোধ থেকে উৎসারিত গণপিটুনির অনুলিপিই দেখি। তবে সোহানী শিফাকে একমাত্র এই অবিবেচক আলাপ উত্থাপনের দায় দিতে চাই না। আমরা দেখেছি, গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাজুড়ে হকারদের পেছনে লাঠি উঁচিয়ে, মব করে, হকারদের ক্রিমিনালাইজড করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক পরিসর থেকে তাড়িয়ে ছিল। দুটি ঘটনাই সোশ্যাল মিডিয়ার ‘পরিপাটি ঢাকা আকাঙ্ক্ষী’ মানুষের মাঝে সাড়া জাগিয়েছে। মধ্যবিত্তের শ্রেণিবিদ্বেষ নান্দনিক আকাঙ্ক্ষার মানসিকতা থেকেই হকার তাড়ানোর প্রচেষ্টা মাঝে মাঝেই শুরু হয়।

এই প্রচেষ্টা থেকে অবধারিত কিছু প্রশ্ন আবির্ভূত হয়। সত্যিই কি যারা এসব আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, তারা কি মনে করে হকারভিত্তিক অর্থনীতি ছাড়া ঢাকা শহর সম্ভব? যে শহরের প্রায় ১ কোটি মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৩০-৩৫ লাখ মানুষ নিম্ন আয়ের ও বস্তিবাসী, সেই মানুষদের শ্রম, সেবা ও দৈনন্দিন অবদানকে বাদ দিয়ে কি এই শহরকে ভাবা যায়?

হকার অর্থনীতি ও মধ্যবিত্তের দ্বৈত অবস্থান

ঢাকা শহর ও হকারভিত্তিক অর্থনীতিকে আলাদা করা যায় না। অর্থনীতি কখনোই সচল হয় না, যদি না সেখানে বিনিময় কিংবা ক্রয়-বিক্রয়ের শর্ত থাকে। যে হকারদের ঢাকাবাসীর একটি আপাত মধ্যবিত্ত অংশ তাদের পরিপাটি নান্দনিকতায় ‘আনফিট’ কিংবা ‘জঞ্জাল’ ভাবছে, সেই হকারদের থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে প্রতিদিনই ক্রেতা হিসেবে এই মধ্যবিত্তরাই আবির্ভূত হচ্ছে।

অফিস শেষে অলিগলির ভ্যান থেকে সবজি কেনা, চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া, কিংবা ফুচকা-বার্গারের স্টলে সময় কাটানো—এসবই ঢাকার মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কম দামে পোশাক, ছোট বাসনকোসন, প্রসাধনী, এমনকি বাসস্ট্যান্ডে হেডফোন বা পাওয়ার ব্যাংকও তারা কিনে হকারদের কাছ থেকেই। অথচ যখন হকার উচ্ছেদের দাবি ওঠে, তখন এই একই শ্রেণির অনেকেই সেটিকে ‘শিক্ষিত সমাজের’ দাবি হিসেবে সমর্থন করে। প্রশ্ন হলো, এই নির্ভরতা আর অস্বীকারের দ্বৈত অবস্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

‘হকারদের কৃষিতে পাঠিয়ে দাও’—একটি মিথ

‘হকারদের কৃষিতে পাঠিয়ে দাও, তাহলেই বাঁচবে ঢাকা’—উন্নয়নের মুখরোচক এই বাণী যারা বলেন, সম্ভবত পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্য ‘সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলার’ ইলুশনে ডুবে থাকেন। মনে হয়, এই দেশে বিশালাকার কৃষি জমি আছে! কৃষিতে কাজ বাদ দিয়ে হকাররা আমোদ করতে ঢাকা শহরে এসেছে। বাস্তবিক প্রেক্ষাপট তা নয়।

এই দেশে দিনে দিনে কৃষি জমি সংকুচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের স্ট্রাকচারাল পলিসি অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসিকে উন্নয়নের একমাত্র অভিধা ধরে কৃষিতে ভর্তুকি উঠিয়েছে সরকার। কৃষিতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ঢাকা শহরের মধ্যবিত্তের ঘরে ভাতের চাল পৌঁছালেও কৃষক তার ন্যায্যমূল্য পায় না। কৃষক সেচের পানি কিংবা কোল্ডস্টোরেজের জন্য উচ্চমূল্য চুকায়। তারপর সঠিক মূল্য না পেয়ে ফসল পুড়িয়ে দেয় নিজেই। ঋণ নিয়ে কৃষিকাজ করে বারবার সেই ঋণের জালে আটকায়। আজ কৃষক যে মূল্য দিয়ে ধান উৎপাদন করে, সেই মূল্যের দ্বিগুণ টাকা দিয়ে বাজার থেকে তাকে চাল কিনতে হয়। কৃষককে ক্রেতা হিসেবে নগরের বাজারেই আসতে হয়। তাই কৃষক বাধ্য হয়ে কৃষি ছেড়ে নগরে আসে।

সম্প্রতি আন্দোলনে আরেকটি কথা এসেছে যে ধান কাটার জন্য ১৫০০-২০০০ টাকা ছাড়া দিনমজুর পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু এটি তো মৌসুমি কাজ। শহরের বহু রিকশাশ্রমিক, হকার এই ধান কাটার কাজ করতে বাড়িতে যায় এবং কাজ সেরে ফিরে আসে। কারণ এই চার মাসের কাজ দিয়ে তার এক বছরের পরিবার চালানোর খরচ ওঠে না।

আবার বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের ‘লেবার ফোর্স ২০২৪’ অনুসারে, বাংলাদেশে এখন ১৭ মিলিয়ন নারী কৃষি কাজে যুক্ত, আর পুরুষ ১৩ মিলিয়ন। গ্রামের যে পুরুষ সদস্য ঢাকায় হকার হচ্ছেন, তার পরিবারের নারী সদস্যরা গ্রামে ঠিকই কৃষি কাজে যুক্ত আছে। নারীদের দিনমজুর হিসেবে তুলনামূলক কম টাকা (১০০০ টাকা) দিয়ে ধান কাটিয়েও নেওয়া হচ্ছে। তারা বাড়ির আঙ্গিনা কিংবা অন্যের জমিতে চাষের কাজও করছে। তাহলে যেভাবে দেখানো হচ্ছে যে কৃষক মাঠে নেই বলেই শহরে হকার বাড়ছে—বাস্তবতা কখনোই এমন না। কিংবা কৃষক এবং হকার বলতে আমরা কেবল পুরুষকেই চোখে দেখছি!

দ্বৈত পেশার বাস্তবতা

আমাদের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে শুধু কৃষিভিত্তিক পরিবার বলে গ্রামে আজ কিছু থাকতে পারছে না। যারা প্রচুর ভূমির মালিক, তারাই কেবল কৃষিভিত্তিক আয়ের ওপর নির্ভর থাকতে পারে। দরিদ্র বর্গাচাষিরা এক বা একাধিক পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকতে বাধ্য হয়। তাই গ্রামে কৃষি আর শহরে রিকশাশ্রমিক কিংবা হকার—মানুষের দ্বৈত পেশার বাস্তবতা ভীষণ প্রাসঙ্গিক। দলে দলে শহরে মানুষ এসেছে কারখানায় কাজ করতে। সেই কারখানাও অটোমেশনের নাম করে ছাঁটাই করেছে শ্রমিক। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই কৃষি বিবর্জিত, কারখানায় কাজ না পাওয়া বা পেয়ে ছাঁটাই হওয়া এক বিপুল জনগোষ্ঠী আজ সরাসরি হকার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

হকার অর্থনীতি কি সত্যিই হুমকি?

সম্প্রতি আন্দোলনটি দেখাতে চেয়েছে যে হকার অর্থনীতি ঢাকা শহরের জন্য হুমকি। কিন্তু তা কি আসলেই বাস্তবসম্মত? হকার অর্থনীতির মতো অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতকে সুসংগঠিত করার মাধ্যমে অনেক রাষ্ট্রই একে আনুষ্ঠানিক খাত হিসেবে বানিয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিশ্বখ্যাত ‘হকার সেন্টার’ ছিল মূলত এরকমই প্রকল্পের অংশ। ১৯৬০-৭০-এর নগরায়ণের সময়ে তারা হকারকে উচ্ছেদ করেনি, বরং হকারকে পেশাজীবী নীতিমালায় এনেছে, লাইসেন্সকৃত করেছে, কম ভাড়ায় নির্দিষ্ট জোন তৈরি করে দিয়েছে। বাংলাদেশে হকারকে রাস্তায় বসতে গেলে চাঁদা হিসেবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক অংশকে (যাকে আমরা চাঁদাবাজ বলতে পারি) যে টাকা দিতে হয়, তা দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি যুক্ত হয় না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় আবদ্ধ সিঙ্গাপুরের হকারদের জোন ভাড়া রাষ্ট্রের কাছেই পৌঁছায়। ঠিক একইভাবে থাইল্যান্ড, লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ এভাবেই হকার-অর্থনীতিকে দেশের মেইনস্ট্রিমিং অর্থনৈতিক খাত বানিয়েছে। হকারকে উচ্ছেদ করে কিংবা হটিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নগরকে ‘জঞ্জালমুক্ত’ করার চিন্তা তারা করেনি। বরং নগরের ইকোসিস্টেমে হকার অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে সংযুক্ত করেছে।

চালের দাম ও সিন্ডিকেট

এই আন্দোলনে যুক্ত হিসেবে আরেকটি কথা উঠে এসেছে যে হকার না তাড়ালে ঢাকার মানুষকে ১৫০ টাকায় চাল কিনতে হবে। ধানের দাম বা চালের দাম কৃষকের হাতে নেই। দাম ঠিক করে ব্যবসায়ীরা। কৃষক যদি দুর্যোগমুক্ত সময়েও সম্পূর্ণ ধান সময়ে কাটে, দেশে ধানের উৎপাদন মাত্রা পূরণ হয়—তাও চালের দাম বাড়তে পারে যদি সিন্ডিকেট তা চায়। এই সিন্ডিকেট না ভাঙলে কখনোই ধান ও চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব না।

কৃষিকাজে মানুষের পেশাভিত্তিক নিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার জন্য কৃষিতে ভর্তুকি, ভূমিহীনের জমির সুষম বণ্টন, সার, কীটনাশক, বীজ বিনামূল্যে প্রদান, সরকার কর্তৃক ফসল কেনা, জেলায় জেলায় সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন, সরকারি কোল্ডস্টোরেজে বিনামূল্যে ফসল রাখার সুবিধা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। তার আগে ‘গ্রামে চলো, কৃষক হও’—একটি মধ্যবিত্তীয় ফ্যান্টাসি বাদে আর কিছুই না!

ঢাকা বাঁচানোর সঠিক পথ

তবে ঢাকা বাঁচাতে হবে। মধ্যবিত্তের নন্দনকল্প হিসেবে ঢাকা বাঁচানোর কথা বলছি না। আমি বলছি ঢাকায় নদীকে বাঁচানোর কথা, যে নদী মেরে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বালুখেকো হয়ে আবাসিক এলাকা বানিয়েছে। ঢাকা বাঁচাতে হবে বস্তিতে স্যানিটেশন নিশ্চিত, নাগরিককে পাবলিক পরিসর থেকে ইচ্ছামাফিক উচ্ছেদ বন্ধ করা, হরিজনদের ভূমির মালিকানা নিশ্চিতকরণ, নির্দিষ্ট ভাড়ায় আশ্রয় নিশ্চিতকরণ, প্রাইভেট যানবাহন সীমাবদ্ধ করে উন্নতমানের পাবলিক যানবাহন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। ঢাকাকে বাঁচানোর বহুবিধ রাস্তা আছে। হকার উচ্ছেদ সেই সমাধানের রাস্তা না, বরং এই ধরনের অ্যাক্টিভিজম জনবিরোধী প্রকল্প।

মারজিয়া প্রভা: লেখক ও নারীবাদী অ্যাক্টিভিস্ট