সুন্দরবনে অপহৃত জেলেদের মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি, ছয়জন এখনো জিম্মি
সুন্দরবনে মৎস্য শিকারে গিয়ে অপহৃত ১৪ জন জেলে মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে, মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় এখনো অন্তত ছয়জন জেলেকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। পূর্ব সুন্দরবনের জেলেপল্লী শেলারচরের মৎস্য ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন মিঠু বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুরে মুঠোফোনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আরিফ হোসেন মিঠু বলেন, 'দস্যুরা চার মহাজনের ১৪ জেলেকে ছেড়ে দিয়েছে। প্রত্যেক জেলের জন্য ৭০-৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দস্যুদের দিতে হয়েছে।' তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, টাকা দিতে না পারায় বাকি জেলেদের মুক্তি এখনো অনিশ্চিত।
বনদস্যুদের ক্রমাগত অপহরণ ও ডাকাতি
বনবিভাগ ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত চার মাসে সুন্দরবন ও সাগরে বেশ কিছু ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে, এ পর্যন্ত শরণখোলা থানায় মাত্র একটি ডাকাতি মামলা রেকর্ড হয়েছে। শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা গ্রামের মৎস্য ব্যবসায়ী ফিরোজ হাওলাদার বাদী হয়ে বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনী প্রধান জাহাঙ্গীরকে প্রধান আসামি করে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি শরণখোলা থানায় একটি ডাকাতি মামলা দায়ের করেন।
ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ধানসাগর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, 'জাহাঙ্গীর ডাকাতের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এই মামলায় অপহৃত জেলেদের জাহাঙ্গীর বাহিনী ইতোমধ্যে ছেড়ে দিয়েছে। দস্যুদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই সুন্দরবনে অভিযান চালানো হবে।'
জেলেদের অপহরণের ধারাবাহিক ঘটনা
গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে বনদস্যু করিম শরীফ বাহিনী পূর্ব সুন্দরবনের শেলার চর শুঁটকি পল্লীতে হানা দিয়ে একটি ট্রলারসহ ৬ জেলেকে অপহরণ করে। এরপর ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় ২০টি ট্রলার থেকে ২০ জেলেকে অপহরণ করেছিল বনদস্যু জাহাঙ্গীর ও সুমন বাহিনী।
শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র দুবলার চরের বিশেষ টহল ফাঁড়ির ফরেস্ট রেঞ্জার মিল্টন রায় অপহৃত জেলেদের মহাজনদের বরাতে বলেন, 'চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা না পাওয়ায় সংঘবদ্ধ দস্যুরা যেকোনো সময় শুঁটকি পল্লীতে হানা দিয়ে ব্যাপক সংখ্যক জেলে অপহরণের হুমকি দিয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুঁটকি উৎপাদনকারী চরগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।'
মিল্টন রায় আরো যোগ করেন যে, দস্যুদের এই হুমকির কারণে স্থানীয় জেলেপল্লীতে নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক জেলে এখন মাছ ধরতে যেতে ভয় পাচ্ছেন, যা তাদের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আতঙ্কে শুঁটকি পল্লী ও জেলেপল্লী
দস্যুদের হুমকি ও অপহরণের ঘটনায় সুন্দরবনের শুঁটকি পল্লী ও জেলেপল্লীতে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দস্যুদের ক্রমাগত হামলা ও চাঁদা আদায়ের চাপে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেকেই এখন রাতে মাছ ধরতে যেতে অনিচ্ছুক, যা তাদের দৈনন্দিন আয়ে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করছে।
বনবিভাগ ও পুলিশ সূত্র মতে, দস্যুদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুন্দরবনে বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে, এখনো পর্যন্ত দস্যুদের দমন করতে পর্যাপ্ত সাফল্য না পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নেতা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জোরালো অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
