মাছ চুরির অপবাদে যুবকের পা ভাঙার অভিযোগ, ভিডিও ভাইরাল
শরীয়তপুরের ডামুড্যায় মাছ চুরির অপবাদে এক যুবককে পিটিয়ে পা ভাঙার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে মাছের ঘেরের মালিক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে, যারা সেলিম পাইক নামের ৩২ বছর বয়সী যুবককে গাছের ডাল ও বাঁশ দিয়ে মারধর করে গুরুতর আহত করেছেন। ঘটনাটি রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ভোরের দিকে ঘটে এবং দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও ভিডিও প্রমাণ
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেলিম পাইককে মাছের ঘের থেকে ধরে এনে নির্মমভাবে পিটানো হয়। একটি ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ব্যক্তি সেলিমের হাত ধরে ঘেরের মাঝখান থেকে পারে নিয়ে আসে। পরে এক ব্যক্তি তার হাত ধরে রাখেন এবং দুই ব্যক্তি মিলে গাছের ডাল দিয়ে তাকে পেটান। এ সময় সেলিম জোরে জোরে 'বাবারে, বাবারে' বলে চিৎকার করতে থাকেন।
আরেকটি ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সেলিমের হাত রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় মাছের ঘেরের মালিক শাহিন মাদবর মোটা একটি শুকনা ডাল দিয়ে তার দুই পায়ে সজোরে আঘাত করেন। এই দৃশ্যের সময় তিন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছিলেন, যা ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
আহতের অবস্থা ও স্থানীয়দের বক্তব্য
আহত সেলিম পাইক উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের ইকুরী গ্রামের মৃত মতলব আলী পাইকের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, তাকে পিটিয়ে পা ভেঙে ডামুড্যার ইকুরি এলাকায় মাটিতে ফেলে রাখা হয়। পরে তার অবস্থা খারাপ দেখে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় অভিযুক্ত শাহিন মাদবর ও তার লোকজনের মাধ্যমে।
ইকুরি এলাকার বাসিন্দা সোহরাব মোল্লা বলেন, 'আমি ফজরের নামাজ পড়ে বাড়িতে যাচ্ছিলাম, তখন দেখতে পাই এক ব্যক্তিকে পুকুর থেকে ধরে এনে কয়েকজন লোক পেটাচ্ছেন। পরে বাড়িতে চলে যাই। বাড়ি থেকে ফিরে এসে দেখি ওই একই ব্যক্তিকে পেটাচ্ছেন; যা অমানবিক ঘটনা।'
অভিযুক্তের বক্তব্য ও পুলিশের তদন্ত
অভিযুক্ত শাহিন মাদবর, যিনি শরীয়তপুর জেলা আন্তঃপরিবহণ মালিক গ্রুপের সাংগঠনিক সম্পাদকও বটে, তার বক্তব্যে পিটানোর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, 'চার মাস আগে আমার ঘেরের মাছ চুরি করছে সেলিম। তখন আমি তাকেসহ সাতজনকে আসামি করে থানায় মামলা করি। আমার ৭০ লাখ টাকার মাছ নিয়ে গেছে তারা। আবার ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে ছয়জন লোকসহ আমার পুকুরে জাল ফেলতে এসে আমার লোকজনকে সেনদা দিয়ে ধাওয়া দিয়েছে সেলিম ও তার লোকজন এবং আমার এক পাহারাদারকে মেরে আহত করেছে। পরে আমার লোকজন ওদের ধাওয়া দিলে ৬ জন পালিয়ে যায়। আর আমার লোকজন সেলিমকে ধরে ফেলে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'ঘের আমার আমি পেটাব না, পেটাবে কে?' এই মন্তব্যে তার দায় স্বীকারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, আহত সেলিম পাইক দাবি করেন, 'আমি মাছ চুরি করিনি। আমাকে মাছ চোরের অপবাদ দিয়ে পিটিয়েছে। আমার পা ভেঙে ফেলেছে। আমি এর বিচার চাই।'
ডামুড্যা থানার ওসি মো. রবিউল হক বলেন, 'বিষয়টি আমি শুনেছি। মাছ চোর সন্দেহে ঘটনাটি ঘটেছে। তদন্ত করার জন্য ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।' পুলিশের তদন্ত এখনও চলমান, এবং ভিডিও প্রমাণসহ ঘটনাটির বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের দাবি
এই ঘটনায় স্থানীয় সম্প্রদায় ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশিত হচ্ছে। অনেকেই ন্যায়বিচার ও দ্রুত শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় ঘটনাটি জাতীয় পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
শরীয়তপুরের ডামুড্যা এলাকায় এই ধরনের সহিংসতা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
