নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় শিশুসহ তিন নিহত, আহত তিন শতাধিক: এইচআরএসএসের প্রতিবেদন
নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় শিশুসহ তিন নিহত, আহত তিন শতাধিক

নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় শিশুসহ তিন নিহত, আহত তিন শতাধিক: এইচআরএসএসের প্রতিবেদন

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক নির্বাচনি সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম লিখিত বক্তব্যে সহিংসতা বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

নিহত ও আহতের বিস্তারিত বিবরণ

এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় মুন্সীগঞ্জে মো. জসিম নায়েব (৩০) নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষক নিহত হয়েছেন, যিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের সমর্থক ছিলেন। বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক ওসমান সরদার (২৯) প্রতিপক্ষের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে নির্বাচনি গোলযোগের জেরে ইমন (১২) নামে এক শিশু নিহত হওয়ার মর্মান্তিক খবর পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, পাবনা, ঝিনাইদহ, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, নাটোর, কুষ্টিয়া ও নোয়াখালীসহ অন্তত ৩০টি জেলায় বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

লোমহর্ষক ঘটনা ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ

প্রতিবেদনে একটি ভয়াবহ ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে তিন সন্তানের জননীকে (৩২) গণধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এইচআরএসএস একে ‘ন্যক্কারজনক ও উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছে।

এছাড়া নির্বাচনি প্রচারণার সময় অন্তত ৩২টি ঘটনায় ৪৫ জন নারী হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবং ২৩ জন নারী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় জামায়াত নারী কর্মীদের হিজাব খুলতে বাধ্য করা এবং টাঙ্গাইলের গোপালপুরে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে পেটে লাথি মারার মতো বর্বরোচিত ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সহিংসতার ব্যাপকতা ও অনিয়মের তথ্য

সংগঠনটি জানায়, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ২৫৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ৬৫০ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনের দিন সারাদেশে ৩৯৩টি অনিয়মের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে এইচআরএসএস, যার মধ্যে ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, জাল ভোট প্রদান এবং পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনা প্রধান ছিল।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আহ্বান ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

সংবাদ সম্মেলনে এইচআরএসএস জানায়, ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সংস্থাটি সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিচ্যুতি রোধে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায়।

এক প্রশ্নের জবাবে ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘হাতিয়ার ঘটনা পর্যবেক্ষণে আমাদের টিম ঘটনাস্থলে গেছেন। তাদের রিপোর্ট পেলে আরও বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান, প্রোগ্রাম ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।