ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের রামাল্লায় ভারতীয় মিশনের আয়োজনে যোগব্যায়াম কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ভারতের সাংস্কৃতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এখন যোগব্যায়াম। ২০১৪ সাল থেকে নরেন্দ্র মোদির সরকার একে সফট পাওয়ারের মূল মাধ্যম হিসেবে জোরেশোরে প্রচার করছে।
যোগব্যায়াম কূটনীতির উত্থান
২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘যোগব্যায়াম সর্বজনীন। যোগব্যায়াম আমাদের শারীরিকভাবে সুস্থ, মানসিকভাবে শান্ত ও আবেগগতভাবে স্বস্তি দেয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এটি কেবল ম্যাটের ওপর কিছু ব্যায়াম করা নয়। যোগব্যায়াম একটি জীবনধারা। স্বাস্থ্য ও কল্যাণের প্রতি এটি একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।’ ভারতের এই যোগব্যায়াম কূটনীতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। দেশটির ‘আয়ুশ’ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এ প্রচার চলছে। এর মাধ্যমে বিশ্বদরবারে ভারতকে শান্তি, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার দেশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি।
ভারতের অভ্যন্তরীণ সমালোচনা
তবে ভারতের ভেতরের পরিস্থিতির কারণে এ উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। মোদি সরকারের আমলে ভারতে সংখ্যালঘুদের প্রতি অসহিষ্ণুতা ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ বেড়েছে। ২০২০ সালে গবেষক অনুশা লক্ষ্মী লিখেছিলেন, ‘নিজের প্রশাসনের সহিংসতা, অনমনীয়তা ও অসহিষ্ণুতা আড়াল করতে মোদি যোগব্যায়ামকে ব্যবহার করছেন।’ আর ফিলিস্তিনে ভারতের এই যোগব্যায়াম কূটনীতি সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে।
ঘটনা ১: ৯ মার্চ ২০২৫
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যেই ফিলিস্তিনে নিযুক্ত ভারতীয় মিশন ‘প্রধানমন্ত্রীর যোগব্যায়াম পুরস্কার’-এর জন্য আবেদন আহ্বান করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা এক গ্রাফিকে মিশন লেখে, ‘জীবন বদলে দিতে যোগব্যায়ামের শক্তি উদ্যাপন করুন।’ অথচ এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ৮ মার্চ ২০২৫ তারিখেও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭ ফিলিস্তিনি নিহত হন। তত দিনে মোট নিহত মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ৪৫৩–তে। আহত হন ১ লাখ ১১ হাজারের বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিলেন আরও হাজার হাজার ফিলিস্তিনি।
এর পরদিন, ৯ মার্চ সকালে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেন। এতে লাখ লাখ মানুষের সুপেয় পানির একমাত্র উৎস ডি-স্যালাইনেশন প্ল্যান্টগুলোর কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ে। তখন রমজান মাস চলছিল। গাজায় ত্রাণের সংকট তীব্র হচ্ছিল। যুদ্ধবিরতির আলোচনাও তখন সুতায় ঝুলছিল। অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন, তুলকারম ও তুবাসে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চলছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যেখানে ১০টি হামলার ঘটনা ঘটেছিল, ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০০টিতে।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা জানায়, ‘২১ জানুয়ারি অভিযান শুরুর পর জেনিন ও তুলকারমের ক্যাম্প থেকে প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর এটিই সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা।’ এমন এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ফিলিস্তিনিদের যোগব্যায়াম করার পরামর্শ দিচ্ছিল ভারত।
ঘটনা ২: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় মিশন থেকে আরেকটি পোস্ট করা হয়। বিশ্ব ধ্যান দিবস উপলক্ষে ফিলিস্তিনিদের ‘দাজি’র সঙ্গে অনলাইনে ধ্যানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানায় মোদি সরকার। ইসরায়েলি বাহিনী যখন গাজার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদগুলো একের পর এক ধ্বংস করছিল, তখন ভারতীয় মিশন ফিলিস্তিনিদের ‘শান্তি, সহানুভূতি ও সংহতির’ জন্য অনলাইন ধ্যানে বসার কথা বলছিল। একে এক চরম নির্মম পরিহাস হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
শুধু তা–ই নয়, ২১ ডিসেম্বর আরও বেশ কিছু ঘটনা ঘটে: হেব্রনের বাইরে মোহাম্মদ ওয়ায়েল আল-শারুফ নামের এক ফিলিস্তিনিকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলি বাহিনী। আল–জাজিরার খবর অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের কাবাতিয়া শহরে অভিযান চালিয়ে ১৬ বছরের এক কিশোরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিনে ইসরায়েল পশ্চিম তীরে ১৯টি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের অনুমোদন দেয়। এমন রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতিতেও ভারতের পরামর্শ ছিল—ফিলিস্তিনিরা যেন ধ্যানে মগ্ন হন।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সমালোচনা
এ পোস্টগুলোকে কেবল ‘ভুল সময়ে করা সংবেদনহীন পোস্ট’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের বর্তমান সম্পর্কের দিকে তাকালে এর পেছনে এক গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শান্তির বার্তা ছড়িয়ে আসলে নিজেদের অপরাধের দায় ও সম্পৃক্ততা আড়াল করতে চায় ভারত। ফিলিস্তিনিদের ‘সহনশীলতা’ বাড়াতে ভারতীয় মিশন বারবার যোগব্যায়ামের গুণগান গাইছে। কিন্তু যে শক্তির কারণে ফিলিস্তিনিদের এ কষ্টের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা নিয়ে ভারত পুরোপুরি নীরব।
গবেষকদের মতে, যোগব্যায়াম বা ‘ওয়েলনেস’ ব্র্যান্ডগুলো এখন আর রাজনীতিমুক্ত নয়। ইসরায়েলেও এর ব্যবহার দেখা যায়। সেখানে জায়নবাদীরা ইসরায়েলপন্থী যোগব্যায়াম প্রদর্শনীর আয়োজন করছে। এমনকি সাবেক ইসরায়েলি সেনারা যুদ্ধের মানসিক ট্রমা কাটাতে যোগব্যায়াম গ্রুপ তৈরি করেছে। ফিলিস্তিনে ভারতের এই যোগব্যায়াম কূটনীতি মূলত একটি নিরপেক্ষ ও কল্যাণকামী ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা। অথচ পর্দার আড়ালে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ও সামরিক সম্পর্ক দিন দিন আরও মজবুত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের কাছে নিজেদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়তে ভারত কেবল যোগব্যায়ামই ব্যবহার করছে না। তারা ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ দিচ্ছে এবং পশ্চিম তীরে ভারত-ফিলিস্তিন ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের প্রচার চালাচ্ছে। অথচ প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা দেশ হলো ভারত। অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ভারত চার গুণ বেশি অস্ত্র কেনে ইসরায়েল থেকে। শুধু তা–ই নয়, ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল যখন ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের ভিসা বাতিল করে, তখন ভারত সেখানে হাজার হাজার নির্মাণশ্রমিক পাঠায়। সম্প্রতি দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে’ রূপান্তর করেছে।
এমনকি ভারতীয় মিশন ফিলিস্তিনে প্লাস্টিক বর্জ্য কমানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও পোস্ট করে। এটি নরেন্দ্র মোদির ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান মিশন: এন্ড প্লাস্টিক পলিউশন’ ক্যাম্পেইনের অংশ। বাস্তবতার নিরিখে এই প্রচারণাও চরম প্রাসঙ্গিকতাহীন। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেটলাররা যেভাবে ফিলিস্তিনিদের জলপাইবাগান ধ্বংস করছে কিংবা ‘জিউশ ন্যাশনাল ফান্ড’ যেভাবে উচ্ছেদ হওয়া ফিলিস্তিনি গ্রামের ওপর পাইনবন তৈরি করছে, তা নিয়ে এই প্রচারণায় কোনো কথা নেই। দখলদারত্ব ও গণহত্যার মুখে দাঁড়িয়ে প্লাস্টিক দূষণ বা যোগব্যায়ামকে সামনে আনা একই সুতায় গাঁথা। এটি মূলত ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের গভীর ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আড়াল করার একটি সুকৌশলী ঢালমাত্র।



