গেল সপ্তাহের শুরুতেই বিশ্ব প্রযুক্তিবাজারের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের আইনি লড়াই শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওকল্যান্ডের একটি আদালতে গত ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল টানা তিন দিন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক। ওপেনএআই ও এর নির্বাহীদের বিরুদ্ধে তাঁর মূল অভিযোগ, তাঁরা ইলন মাস্ককে প্রতারিত করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে অর্থ বিনিয়োগ করিয়েছেন, যা এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক এআই কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
মামলার বিবরণ
সাবেক সহকর্মী ও বর্তমান ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী স্যাম অল্টম্যান ও গ্রেগ ব্রকম্যানের বিরুদ্ধে মাস্ক এ মামলা করেছেন। মাস্কের দাবি, ওপেনএআইয়ের মূল লক্ষ্য ছিল একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানবতার কল্যাণে কাজ করা। কিন্তু অল্টম্যান ও তাঁর সহযোগীরা সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে মুনাফা-সন্ধানী ব্যবসায় পরিণত করেছেন এবং নিজেদের আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। এ মামলায় মাইক্রোসফটকেও বিবাদী করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে দাতব্য ট্রাস্টের বিশ্বাস ভঙ্গের সহায়তার অভিযোগ এনেছেন মাস্ক।
আদালতে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাস্ক বারবার ওপেনএআইয়ের আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিটের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। স্যাভিট যখন মাস্ককে কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দিতে বলেন, তখন মাস্ক পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘আপনার প্রশ্ন সহজ নয়, এগুলো আমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য সাজানো হয়েছে।’ একপর্যায়ে বিচারক ইভন গঞ্জালেস রজার্স মাস্ককে সতর্ক করে বলেন, যেন তিনি অপ্রাসঙ্গিক কথা না বলে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দেন। এমনকি এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তি ঘটবে কি না, এমন তাত্ত্বিক বিতর্কে না জড়াতেও উভয় পক্ষকে নির্দেশ দেন বিচারক।
ওপেনএআইয়ের আইনজীবীর বক্তব্য
ওপেনএআইয়ের আইনজীবীর দাবি, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইলন মাস্ক ওপেনএআইয়ের বোর্ড ছেড়েছিলেন। কারণ, তিনি প্রতিষ্ঠানটির একক নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন এবং তাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এখন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান এক্সএআইকে সুবিধা দিতেই তিনি এ মামলা করেছেন। তবে ইলন মাস্ক এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, স্পেসএক্স ও টেসলার কাজে মনোযোগ দিতেই তিনি বোর্ড ছেড়েছিলেন। তিনি যুক্তি দেন, ‘একটি মুনাফা-সন্ধানী প্রতিষ্ঠান গড়ায় কোনো ভুল নেই, কিন্তু আপনি একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে চুরি করতে পারেন না।’
আদালতে উপস্থাপিত ই-মেইল ও নথিপত্র
জেরার সময় ২০১৫ ও ২০১৭ সালের বেশ কিছু ই-মেইল ও নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়। সেখানে দেখা যায়, ওপেনএআই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর আগেই মাস্ক একটি মুনাফা-সন্ধানী শাখা খোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এমনকি ২০১৭ সালে তাঁর উপদেষ্টাদের একটি ফর-প্রফিট করপোরেশন রেজিস্ট্রি করার নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি। এ তথ্যের বিপরীতে মাস্কের দাবি, তিনি মুনাফা-সন্ধানী সাবসিডিয়ারি থাকার বিরোধী ছিলেন না, যদি সেটি মূল অলাভজনক লক্ষ্যকে ছাপিয়ে না যায়। তাঁর মতে, বর্তমানে ওপেনএআই পুরোপুরি বাণিজ্যিক সংস্থায় পরিণত হয়ে তাঁর মূল উদ্দেশ্য হারিয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালের বেশ কিছু মেসেজ ও ই-মেইল আদালতে দেখানো হয়, যেখানে স্যাম অল্টম্যান মাইক্রোসফট থেকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নেওয়ার পরিকল্পনা ইলন মাস্ককে জানিয়েছিলেন। একটি টার্ম শিটে এক হাজার কোটি ডলার সংগ্রহের কথা উল্লেখ ছিল, যা মাস্ক এড়িয়ে যান। মাস্কের ভাষ্যমতে, তিনি তখন নথিপত্রের সূক্ষ্ম লেখা পড়েননি। পরে ২০২২ সালে যখন মাইক্রোসফট এক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে এবং ওপেনএআইয়ের বাজারমূল্য দুই হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়, তখন মাস্ক অল্টম্যানকে মেসেজে লিখেছিলেন, এটি প্রতারণার মাধ্যমে প্রলুব্ধ করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
মাস্কের উদ্বুদ্ধকরণ ও বিচারকের মন্তব্য
ইলন মাস্কের সাক্ষ্যে দেখা যায়, গুগল ডিপমাইন্ডের দ্রুত অগ্রযাত্রার কারণে তিনি ওপেনএআই প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন গুগলের ক্লোজড সোর্স এআইয়ের বিপরীতে একটি ওপেন সোর্স অলাভজনক বিকল্প তৈরি করতে, যা মানবজাতির জন্য নিরাপদ হবে। তিনি মনে করেছিলেন, গুগল এআই নিরাপত্তার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়। অবশ্য বিচারক রজার্স স্পষ্ট করে বলেছেন, এই বিচার এআই মানবজাতির ক্ষতি করছে কি না, তা নিয়ে নয়। এটি চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আইনি কাঠামোর লড়াই। মামলার পরবর্তী শুনানিতে মাইক্রোসফট ও স্যাম অল্টম্যানের সাক্ষ্য গ্রহণের কথা রয়েছে। আগামী শুনানি হবে ৪ মে।



