টিকা কিনতে পদ্ধতি বদল, ২৮০ শিশুর মৃত্যু: সায়েন্স জার্নাল
টিকা কিনতে পদ্ধতি বদল, ২৮০ শিশুর মৃত্যু: সায়েন্স

মে মাসের প্রথম দিনটি ভয়ংকর এক খবর দিয়ে শুরু হয়েছে। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘সায়েন্স’ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইউনিসেফের সতর্কতা উপেক্ষা করে টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তন করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। এই সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে সম্প্রতি ২৮০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই শিশুরা দেশ থেকে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে।

টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তন ও তার প্রভাব

সায়েন্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করার কারণে সরবরাহে দেরি হয় এবং বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি থমকে যায়। এর ফলে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে টিকা কেনার ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি হয়। সেখান থেকেই হাম মহামারির সূত্রপাত। সংকটের কারণে দেশজুড়ে টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং টিকাদানের হার কমে যায়। অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে।

টিকাদান কর্মসূচির বাস্তবতা

বাংলাদেশে ৯ ও ১৫ মাস বয়সী শিশুদের হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। সারা দেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রতি চার বছর পরপর দেশব্যাপী এই কর্মসূচি চালানো হয়। টিকা সরবরাহ করত ইউনিসেফ, যার অর্থায়ন আসত গ্যাভি ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টিকা সরবরাহ পদ্ধতিতে একটি বিতর্কিত পরিবর্তন আনে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে। ইউনিসেফ তখন এর তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করে জানায়, এই পদ্ধতি টিকাদান ব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ওই দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে গেলে টিকার মজুত ফুরিয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান বন্ধ হয়ে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইউনিসেফের প্রতিক্রিয়া

বিষয়টি খুবই হতাশাজনক ছিল জানিয়ে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সায়েন্স জার্নালকে বলেন, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে অনুরোধ করেছিলেন ‘যেন এটি না করা হয়’। কিন্তু নূরজাহান বেগম কথা রাখেননি।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

নূরজাহান বেগমের সরকারের সময়ে মাঝে মাঝে ভুলেই যেতাম, এই নামে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা পদে কেউ আছেন। সাংবাদিকতাসূত্রে স্বাস্থ্য খাতে কাজ করার সুবাদে আগের স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। করোনার সময়ে তো দিনে-রাতে কথা বলতে হতো। কিন্তু স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে কখনো তার মোবাইল ফোনে রিচ করা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলে এক সহকর্মী জানান, তিনি নূরজাহান বেগমের ফোন কল ধরেছিলেন। ‘তাহলে তো তুমি ভাগ্যবান’ বলে রিপ্লাই করলে তিনি জানান, ভাগ্যবান কিনা জানেন না। তবে নূরজাহান বেগমকে প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য তাদের মুখপাত্র রয়েছেন। ‘স্বাস্থ্য খাতের মুখপাত্র কে’ জানতে চাইলে নূরজাহান বেগম বলেছিলেন, ‘সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান’। স্বাস্থ্য খাতের রুগ্ন দশা বোঝা যায় এই উত্তর থেকেই।

বিশেষ সহকারী নিয়োগ ও আশা

তবে স্বাস্থ্যে একেবারেই আশার কিছু ছিল না, তা নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। যাকে ‘খসরু স্যার’ বলে ডাকা হয়। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী পদে যাওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে যুদ্ধ করে গেছেন। তার নিয়োগের পর ভেবেছিলাম, এবার বুঝি রুগ্ন স্বাস্থ্য খাত ভগ্নদশা থেকে বেরিয়ে হৃষ্টপুষ্ট হবে। কিন্তু পরে দেখলাম—‘বেশি কিছু আশা করা ভুল/বুঝলাম আমি এতদিনে/ মুক্তি মেলে না সহজে/জড়ালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে’।

হামের প্রকোপ ও শিশুমৃত্যু

ক্ষোভ আর কষ্টের পাহাড় থেকে দেশের অবস্থা দেখা যাক। শিশুরা মারা যাচ্ছে কেবল নিশ্চিত হামেই নয়, হামের উপসর্গ নিয়েও থেমে যাচ্ছে কচি প্রাণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাচ্ছে, শনিবার (২ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ৯৬ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭২ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে চার শিশুর। একদিনে ১ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে হাম ও হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে।

১৫ মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৩৮ হাজার ৩০১ শিশু। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬ হাজার ৯১১ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৩ হাজার ২২৫ জন। এই রোগীদের মধ্যে ৫ হাজার ১৪৬ শিশুর হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। হামে সংক্রমিতদের মধ্যে মারা গেছে ৪৯ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৩৫ জনের। মোট মৃত্যু ২৭৭ জনের।

হামের প্রকোপ শুরুর পর ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় ২০ এপ্রিল থেকে। কিন্তু তাতে কি রক্ষা হচ্ছে? অবস্থা এতই ভয়াবহ যে, প্রথমে ঢাকার মহাখালীতে ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালকে হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের সব হাসপাতালকে নির্দেশ দেয়, হামের রোগীকে ফেরাতে পারবে না কোনো হাসপাতাল, সব হাসপাতালকে রোগী ভর্তি করাতে হবে।

টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য ও বর্তমান সংকট

অথচ বাংলাদেশে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে একসময় গর্ব করা হতো। স্বাস্থ্য বিটে কাজ করার সুবাদে জানি, ক্যাম্পেইন হতো, শহর থেকে গ্রাম টিকাদানকে কেন্দ্র করে সাজসাজ রব হতো। সংবাদকর্মীদের আগে থেকে জানানো হতো, কোথায় উদ্বোধন হবে, কত শিশুকে টিকা দেওয়া হবে, কত সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করবেন, কী কী সাবধানতা অবলম্বন করা হবে, কোথাও কোনো সমস্যা হলে কী করতে হবে—সবকিছু। বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। দেশে ২০১০ সাল থেকে শিশুর সব ধরনের টিকার ৮০ শতাংশের বেশি কভার হতো। মাঝে করোনাকালে কিছুটা স্থিতিশীল হওয়া ছাড়া ২০১২ সাল থেকে হাম-রুবেলার সম্মিলিত টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) চালু হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টিকার কভারেজ ছিল ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু ‘সময়ে এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়’।

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন

সায়েন্স জার্নালের প্রতিবেদনের পর সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি, তবে সায়েদুর রহমান ফেসবুকে জবাব দিয়েছেন। তিনি টিকার ক্রয়পদ্ধতি নিয়ে কঠিন ভাষায় নানা কথা লিখেছেন। কিন্তু তিনি বলেননি, দেশে ইপিআই কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। প্রশ্ন হলো, টিকা কর্মসূচির মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির টিকা কেনার নীতিমালা পরিবর্তন জরুরি ছিল, নাকি টিকাদান কর্মসূচি যেন নিয়মিত থাকে তার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল? টিকার সংকট ও টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি আগাম কোনো সতর্কতা জারি করেছিল? জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল কি?

কানাডার প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ডা. মারুফুর রহমান অপু, যিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন, তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘টিকার মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইন্টেরিম সরকারের এক্সপেরিমেন্ট না করলে কি হতো না?’ তিনি আরও বলেছেন, ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি না থাকলে ডিরেক্ট প্রক্রিউরমেন্ট ন্যায়সঙ্গত না—এমনটা বলার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি যে তৈরি হলো, শত শত শিশু যে মারা গেলো বা মারা যাচ্ছে তার দায় কে নেবে?’

তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এত বড় সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের হাতে না দিয়ে কেন নিজেরা এক্সপেরিমেন্ট করলেন?’ তাঁর ভাষ্য, ‘হামের টিকা ক্যাম্পেইন ২০২৪ সালে হওয়ার কথা ছিল। এর মাঝে অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর সময় পেয়েছে। হেলথ এসিস্টেন্টদের আন্দোলন সত্ত্বেও দুটি নন-ইপিআই টিকা ক্যাম্পেইন করেছে আড়ম্বর করে। তাহলে হামের টিকা ক্যাম্পেইন কেন হলো না? ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন কেন হলো না?’

শেষ কথা

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে কি না, আমরা সাধারণ মানুষ জানি না। কেবল জানি, মাদারীপুর থেকে ঢাকা—চার হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচানো যায়নি ১০ মাসের সোহামনিকে। শিশুটির মা লিমা আক্তার গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘মেয়েরে শুধু হামের টিকাটা দিতে পারি নাই। এলাকার টিকাকেন্দ্রে তিনবার নিয়ে গেছি। কেন্দ্র থেকে প্রতিবারই বলেছে, সরকারি টিকা নাকি বন্ধ আছে। পরে মেয়েরে নিয়ে সদর হাসপাতালে যাই। ওইখানে টিকা ছিল, কিন্তু বলছে নির্দিষ্ট টিকাকেন্দ্র থেকেই টিকা নিতে হবে, তারা দিতে পারবে না। এই করতে করতে মেয়ে তো হামে মরেই গেল।’ লিমা আক্তার জানেন না স্বাস্থ্যের সাবেক বিশেষ সহকারীর ডিরেক্ট প্রক্রিউরমেন্ট ন্যায়সঙ্গত কি না, কেবল জানেন, ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, সোহামনিদের প্রাণ যায়’।