চট্টগ্রাম সিটির মেয়াদ বিতর্ক: আদালতের রায়ে মেয়র হলেও মেয়াদ নিয়ে দ্বিধা
চট্টগ্রাম সিটির মেয়াদ বিতর্ক: মেয়র শাহাদাতের মেয়াদ কতদিন?

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ গত ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। কিন্তু আদালতের রায়ে মেয়র ঘোষিত হওয়া বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন এখনো মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শাহাদাত হোসেনের দাবি ও আইনি ব্যাখ্যা

শাহাদাত হোসেনের দাবি, আদালতের আদেশে মেয়র ঘোষিত হওয়ার পর তিনি ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর দায়িত্ব নিয়েছেন। সে হিসাবে তাঁর মেয়াদ ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের নথি ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা বলছে, ২০২১ সালের নির্বাচিত পরিষদের সঙ্গে মেয়র হিসেবে শাহাদাত হোসেনের মেয়াদও শেষ হয়েছে। পরে শপথ নিলেও বাড়তি মেয়াদ পাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ

গত মার্চে সরকার ঢাকার দুই সিটিসহ ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। তখন মেয়াদ শেষ হওয়ায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিষদে বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেনকেই পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের একটি প্রস্তাবও তৈরি করেছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। পরে সেটা আর এগোয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্বাচন ও আদালতের রায়

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি। ওই নির্বাচনে মেয়র পদে জয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। ৪১টি সাধারণ ও ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সব কটিতে জয় পান দলটির সমর্থকেরা। এই পরিষদের প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি।

নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামসহ ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২৪ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায়ে মো. রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণা বাতিল এবং মামলার বাদী শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করা হয়। ওই বছরের ৩ নভেম্বর মেয়র হিসেবে শপথ নেন শাহাদাত হোসেন।

প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগের জন্য মার্চে প্রস্তাবসহ নথি তৈরি করেছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। পরে আদেশ জারি না করে সেই নথি সরিয়ে রাখা হয় বলে স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের ওই নথিতে বলা হয়, আদালত শাহাদাত হোসেনকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা করলেও মেয়াদের কোনো নির্দেশনা ছিল না। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের প্রথম সভা ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯–এর ধারা ৬ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০১১–এর ধারা ৪ অনুযায়ী পরিষদের মেয়াদ পাঁচ বছর; সেই মেয়াদ চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯–এর সংশোধিত ধারা ২৫ (ক) অনুযায়ী, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত শাহাদাত হোসেনকে প্রশাসক পদে নিয়োজিত করা যেতে পারে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, শাহাদাত হোসেন মেয়র পদে থাকার পক্ষে আইনি ব্যাখ্যাসহ কিছু নথিপত্র দিয়ে গেছেন। সেটা এখনো পর্যালোচনা করা হয়নি।

এর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ৩ ফেব্রুয়ারি চিঠি দিয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ।

আইনি ধারা ও সংশোধনী

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯–এর ধারা ৬–এ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, করপোরেশন গঠিত হওয়ার পর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ থাকবে। তবে ওই আইনে তখন একটি শর্ত ছিল—সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হলেও পুনর্গঠিত সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তা দায়িত্ব পালন করে যাবে।

কিন্তু ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর এই ধারা সংশোধন করে আগের আইনের যে অংশে বলা ছিল, ‘তবে শর্ত থাকে যে সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তা পুনর্গঠিত সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাবে’—সেই অংশ বিলুপ্ত করা হয়।

মেয়র শাহাদাতের যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি

মেয়র শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আদালত তাঁকে বৈধ মেয়র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাঁর দাবি, আদালতের আদেশে তাঁর মেয়াদ ২০২৯ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত। এই আদেশ রদ করতে হলে আদালতের আরেকটি আদেশ লাগবে। আর যে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটি হচ্ছে অবৈধ মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। আবারও ব্যাখ্যা দেবেন।

তবে নথিপত্র বলছে, আদালতের যে রায়ে শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে কোনো মেয়াদের কথা আলাদাভাবে বলা হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং স্থানীয় সরকারবিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। শাহাদাত হোসেন আদালতের আদেশে মেয়র নির্বাচিত হলেও তিনি ওই পরিষদের মেয়াদের জন্যই নির্বাচিত হয়েছেন। কেননা তিনি ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন পাঁচ বছরের জন্য। তাই পরে নির্বাচিত হলেও তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়া উচিত; এটাই যৌক্তিক।