জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি পদে লড়ছে বাংলাদেশ। প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে। আগামীকাল মঙ্গলবার (২ জুন) নিউ ইয়র্কে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে বাংলাদেশ জয়লাভ করলে দ্বিতীয়বারের মতো দেশের প্রার্থী ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি পদে বসবে। প্রথমবার ১৯৮৬ সালে এই পদে বসেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী। তিনি মন্ত্রিত্ব থেকেই সভাপতির পদে বসেছিলেন। একই কাজ করতে চান ড. খলিলুর রহমান।
নির্বাচনের সময় ও প্রতিদ্বন্দ্বী
৮১তম অধিবেশনের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির নির্বাচন আগামীকাল নিউ ইয়র্ক সময় সকাল ১০টায় ইউএনএইচকিউর জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক আবর্তন অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে নির্বাচিত হবেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের বহুপাক্ষিকতা-বিষয়ক বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস কাকুরিস এক বছরের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যিনি জয়লাভ করবেন, তিনি আগামী এক বছরের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি এবং জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন।
একসঙ্গে দুই পদে থাকা নিয়ে বিতর্ক
ড. খলিলুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা কিংবা সমালোচনা না হলেও মন্ত্রিত্ব থাকা অবস্থায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতির পদে থাকা নিয়ে আছে প্রশ্ন। এমন প্রশ্ন আগেও উঠেছিল বলে সাবেক কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে। একইসঙ্গে দুই পদে থাকা বিষয়ে জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির সঙ্গে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি আয়োজিত সংলাপে স্পষ্ট করেছেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, পদত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না। তিনি ছুটি নেবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এতে ‘সায়’ দিয়েছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে অল্প হলেও একইসঙ্গে দুই পদে থাকার নজির আছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যারা প্রার্থী ছিলেন, তারা রাষ্ট্রীয় কোনও দায়িত্ব ছিলেন না। সাবেক কূটনীতিক, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক প্রেসিডেন্ট এমন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
ড. খলিলুর রহমানের ভাষ্য, ‘আমি কি পদত্যাগ করবো? না, আমার প্রধানমন্ত্রী আমাকে খুব পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ‘তিনি আমাকে এক বছরের জন্য পূর্ণকালীন চাকরি করার জন্য ছেড়ে দেবেন।’ পদত্যাগ একমাত্র বিকল্প নয়, আমি ছুটি পেতে পারি।’
যদিও মালদ্বীপের আবদুল্লাহ শহীদ ২০২১ সালে ইউএনজিএ’র ৭৬তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় একসঙ্গে তার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালাবে কে?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী জাতিসংঘের প্রধান আলোচনামূলক ও নীতিনির্ধারণী সংস্থার প্রধান প্রিসাইডিং অফিসার এবং চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। এক বছরের মেয়াদে নির্বাচিত সভাপতি সভার নেতৃত্ব দেওয়া, বিতর্ক পরিচালনা এবং পরিষদের সামগ্রিক এজেন্ডা পরিচালনা করার জন্য দায়বদ্ধ। তার মূল দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—সভা পরিচালনা, এজেন্ডা পরিচালনা এবং কূটনৈতিক নেতৃত্ব। সভাপতি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে আলোচনার গাইড করেন, উচ্চ পর্যায়ের ইভেন্টগুলোতে ইউএনজিএ’র প্রতিনিধিত্ব করেন এবং অ্যাসেম্বলির জরুরি বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করার কর্তৃত্ব রাখেন। এছাড়া তিনি সাধারণ পরিষদের প্রধান কমিটি এবং সহ-সভাপতিদের কাজের তদারকি করেন, জাতিসংঘের বার্ষিক অধিবেশনের মসৃণ অগ্রগতি নিশ্চিত করেন।
যেহেতু ইউএনজিএ সর্বজনীন প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে একমাত্র জাতিসংঘ সংস্থা, সভাপতির ভূমিকা নির্বাহী বিভাগের চেয়ে প্রাথমিকভাবে পদ্ধতিগত এবং কূটনৈতিক। তাদের অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে, পরিষদে সভাপতিত্ব করার সময় তাদের নিজ দেশের পক্ষে কোনও ভোট দেবে না এবং তারা চূড়ান্তভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে জবাবদিহি করবে।
জাতিসংঘের সভাপতি পদে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রশ্নে মূল বিতর্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করা। এই প্রসঙ্গে খলিলুর রহমানের ভাষ্য, ‘আমি আপনাদের সবার প্রেসিডেন্ট হতে চাই এবং আমি এমন একজন প্রেসিডেন্ট হতে চাই, যিনি সব সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত উপায়ে তার কাজ করবেন। তবে আমি ছোট প্রতিনিধিদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ রাখবো, যা কম সংখ্যক প্রতিনিধিত্ব করে। আমার অফিস, যেমনটি আমি বলেছি, সব ধরনের প্রতিনিধি দলকে অন্তর্ভুক্ত করবে।’
তিনি জানান, ‘আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে আমি এই সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বকে একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখবো এবং আপনি যদি আমাকে আমাদের বর্তমান প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার অনুমতি দেন, তবে আমিও উত্তরাধিকার সূত্রে পাবো এবং আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ অব্যাহত রাখবো। এভাবেই আমরা ভবিষ্যতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আমি ব্যর্থতা ছাড়াই জাতিসংঘ সনদ মেনে চলবো এবং আমি নিয়ম এবং পদ্ধতিগুলো সবচেয়ে সঠিক উপায়ে প্রয়োগ করবো। সুতরাং এগুলো আমার প্রতিশ্রুতি।’
তবে কূটনীতিকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পদ ধরে রেখে জাতিসংঘে নিরপেক্ষতা না চাইলেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
জাতিসংঘে কাজ করেছেন সাবেক একজন কূটনীতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট রোহিঙ্গা ইস্যু। এটিকে আলোচনায় রাখতে জাতিসংঘ একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যদি জাতিসংঘ সভা আহ্বান করে তাহলে সেখানে যদি ভিক্টিম হিসেবে বাংলাদেশের মন্ত্রী সভাপতিত্ব করেন, তাহলে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তিনি বলেন, এটা একটা শুধু উদাহরণ মাত্র। দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটা মন্ত্রণালয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি ছুটিতে থাকেন, তাহলে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করার কাজে, কিংবা দেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে কে, সেটিও একটা প্রশ্ন। জাতিসংঘের নিজস্ব কূটনীতি আছে, আবার দেশেরও নিজস্ব কূটনীতি আছে, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুটি সামাল দেওয়া একসঙ্গে বেশ কঠিন হবে।
উল্লেখ্য, ড. খলিলুর রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ড. রহমান ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নিয়মিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সেবায় যোগদান করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮০-৮৩-এর মধ্যে তিনি ফ্লেচার স্কুল অফ ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি, টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেনেডি স্কুল অফ গভর্নমেন্ট, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৩-১৯৯১ সালের মধ্যে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র ছিলেন। ড. রহমান ১৯৯১ সালে জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (ইউএনসিটিএডি) বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগদান করেন। জাতিসংঘে পরবর্তী ২৫ বছরের সময়ে, তিনি নিউ ইয়র্ক এবং জেনেভায় জাতিসংঘের সিনিয়র পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং জাতিসংঘের প্রধান ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনাগুলোর প্রধান লেখক এবং উল্লেখযোগ্য অবদানকারী ছিলেন। ড. রহমান ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন।



