স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য দলীয় ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অপরিহার্য। ফার্নান্দো ক্যাসালের মতে, দলীয় ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় যখন দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থিতিশীল ও অনুমানযোগ্য হয়। নির্বাচনের রাতেই বোঝা যায় কারা সরকার গঠন করবে। যুক্তরাজ্যে লেবার বা কনজারভেটিভরা জিতলে একক দল হিসেবে সরকার গঠন করে। সুইডেনে নির্দিষ্ট জোট বা ব্লক রয়েছে। অন্যদিকে, অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় সরকার গঠন অনিশ্চিত থাকে।
প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের গুরুত্ব
অনুমানযোগ্য পরিবেশ রাজনৈতিক আচরণকে স্থিতিশীল করে। দলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ থাকলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও দুর্নীতি কমে। অস্থিতিশীল ব্যবস্থায় দলগুলো মনে করে আগামী নির্বাচনে তাদের অস্তিত্ব থাকবে না, ফলে চুরি ও বন্ধুবান্ধবকে সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এতে জনগণ ক্যারিশমাটিক নেতার সন্ধান করে, যা একনায়কতন্ত্রের পথ সুগম করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে পরপর দুটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। আন্দোলন ছাড়া ক্ষমতাসীনদের সরানো যায় না। দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ভঙ্গুর। সরকার বিরোধী দলকে নির্মূলের চেষ্টা করে। ক্যাসাল মনে করেন, এশিয়ায় জাপান, তাইওয়ান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক দলীয় ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের সমস্যা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অভাব নয়, বরং দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের মূল চেতনার অভাব। তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। গণতন্ত্রের মূল কথা হলো ক্ষমতার পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন, পারস্পরিক সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযম। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও বিরোধী দলের মতপ্রকাশ ও কাজ করার অধিকার সম্মান করতে হবে। প্রকৃত দলীয় ব্যবস্থা তখনই সম্ভব যখন অন্তত দুটি দল অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। অন্যথায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বা ১৯৯৪ সালের আগের মেক্সিকোর মতো অতি-প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ দেখা যেতে পারে, যেখানে এক দল সব সময় জিতত কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না।
সামাজিক চুক্তি নয়, পারস্পরিক সম্পর্ক
ক্যাসাল বলেন, দলীয় ব্যবস্থা কোনো সামাজিক চুক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ। একনায়কতন্ত্র বা একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক যোগাযোগ থাকে না। গণতন্ত্র হতে হবে একমাত্র নিয়ম, যাতে নির্বাচন, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমে বিরোধী দলের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত। বাংলাদেশ বর্তমানে আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ নানা সংকটে রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
ক্যাসালের গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের উপস্থিতি দলীয় ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক করে না। এটি নির্ভর করে অর্থায়নের পরিমাণ ও উদারনৈতিক কাঠামোর ওপর। উচ্চমাত্রার অর্থায়ন দলকে সামাজিকভাবে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে পারে, তবে এর জন্য জবাবদিহির কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন, কোর্ট অব অডিটরস বা দুর্নীতি দমন কমিশন তদারকি করতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশনের কিছু ক্ষমতা থাকে যা নির্বাচন কমিশনের নেই। যুক্তরাজ্যে নির্বাচন কমিশনই এই কাজ ভালো করে।
রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের অনীহা
সত্তর দশকের শেষ থেকে রাজনৈতিক দলের সংকট নিয়ে আলোচনা চলছে। দলগুলো মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। সুসংহত গণতন্ত্রে 'কার্টেলিজেশন' দেখা যায়, যেখানে দলগুলো রাষ্ট্রের ভেতরে নিজেদের আখের গোছায় এবং ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব না করে ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেয়। ভোটাররা বাম-ডানের তফাত না পেলে হতাশ হয় এবং জনতুষ্টিবাদী ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী দলের উত্থান ঘটে। তবে রাজনৈতিক দল ছাড়া প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র সম্ভব নয়। টুভালুর মতো ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রই দল ছাড়া চলে। বড় দেশে জনগণের নানামুখী স্বার্থকে এক সুতায় বাঁধতে দল প্রয়োজন। গণ-আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হতে হবে। সমাধান হলো কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ দল গড়ে তোলা, যাদের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে।
জনতুষ্টিবাদের সুযোগ
জনতুষ্টিবাদীরা সমস্যা চিহ্নিত করতে পারদর্শী, যেমন অভিবাসন সমস্যা। প্রথাগত দলগুলো এড়িয়ে গেলে জনতুষ্টিবাদীরা সুযোগ নেয়, কিন্তু তাদের সমাধান সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে জনতুষ্টিবাদীদের সরকারে আসা সুযোগ হতে পারে, মানুষ বুঝতে পারে তারা প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে না। আসল বিপদ যখন তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় (যেমন হাঙ্গেরি) এবং ব্যবস্থাকে অনুদার গণতন্ত্রে রূপান্তর করে।
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিষয়ে মতামত
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্যাসাল বলেন, শান্তিপূর্ণ উত্তরণের জন্য পূর্ববর্তী শাসনের সঙ্গে বোঝাপড়া প্রয়োজন। কমিউনিস্ট-পরবর্তী দেশে অনেক কমিউনিস্ট দল সোশ্যালিস্ট বা ডেমোক্রেটিক পার্টিতে রূপান্তরিত হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে অপরাধ না থাকলে তাদের রাজনীতিতে গ্রহণ করা হয়। বিচার করা উচিত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের, পুরো দলের নয়। গণতন্ত্রের নিজেকে রক্ষার অধিকার আছে ('মিলিট্যান্ট ডেমোক্রেসি')। কোনো দল গণতান্ত্রিক নিয়ম মানতে অস্বীকার করলে, সহিংসতা বেছে নিলে বা বিরোধী দলকে হুমকি দিলে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। ইউরোপে সাধারণত সহিংসতার পথ না ধরলে দল নিষিদ্ধ করা যায় না। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা বলে, দল নিষিদ্ধ শেষ পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পতিত দলের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ক্যাসাল বলেন, কোনো দল যদি এ ধরনের অপরাধের জন্য দায়ী হয়, তবে তার বিচার হতে পারে। জার্মানিতে নাৎসি পার্টি ও অনেক দেশে কমিউনিস্ট দল নিষিদ্ধ হয়েছে। নীতিগতভাবে তিনি দল নিষিদ্ধের বিপক্ষে, তবে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ী দল নিষিদ্ধ করা যায়। তবে দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর নতুন নামে পুনর্গঠিত হলে, যেখানে আগের অপরাধের জন্য দায়ী নেতারা থাকবেন না এবং যারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মেনে চলবে, তাদের অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো যতক্ষণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, ততক্ষণ অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে।
বাংলাদেশের রূপান্তরকালে করণীয়
ক্যাসাল স্পেনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি। স্পেনে 'মনক্লোয়া চুক্তি' হয়েছিল, যেখানে সব দল মিলে অর্থনীতি, পেনশন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক সমস্যা সমাধানের জন্য এক টেবিলে বসেছিল। গণতন্ত্রের মূল নির্যাস হলো একে অপরের সঙ্গে কথা বলা ও সমঝোতায় পৌঁছানো। বাংলাদেশে একটি সমস্যা হলো সরকার সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাদের স্বাক্ষরিত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে চায় না। এটি ভোটারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও গণতন্ত্রের প্রতি নাগরিকদের বিশ্বাস নষ্ট করে। এটি একটি আত্মঘাতী কৌশল।
স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য পারস্পরিক সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযম প্রয়োজন। নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার আইনি ক্ষমতা থাকলেও প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা ও আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগ সব সময় থাকতে হবে, যেখানে দলগুলো অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসবে। বাংলাদেশের সামনে একটি বিশাল সুযোগ এসেছে, এটি নষ্ট করা উচিত নয়।



