অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাস: রিউমর স্ক্যানারের তথ্যে ৮৮৮টি অপতথ্য শনাক্ত
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ৮৮৮ অপতথ্য শনাক্ত

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অপতথ্যের বিস্তার: একটি বিশ্লেষণ

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে সরকার গঠনের পরদিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভুয়া দাবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বলা হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছয় বছর ক্ষমতায় থাকবে। এই দাবিটি প্রচার করতে চ্যানেল২৪ ও যমুনা টিভির নাম জুড়ে দেওয়া হয়, যদিও রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম দুটি এমন কোনো তথ্য প্রচার করেনি।

ড. ইউনূস ও উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার

পরবর্তী ১৮ মাসে এই সরকারকে জড়িয়ে নিয়মিতভাবে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল ইন্টারনেটে। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফ্যাক্টচেকগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সরকারের উপদেষ্টা ও প্রেস উইংকে জড়িয়ে মোট ৮৮৮টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িয়ে ৩৬৪টি অপতথ্য প্রচারিত হয়েছে, যেখানে নেতিবাচক প্রচারণার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তিনি।

২০২৫ সালের মে মাসের শেষদিকে ড. ইউনূসের পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়ায়, যা মাত্র চারদিনে অন্তত ১৬টি ভুয়া তথ্যের জন্ম দেয়। দায়িত্বে থাকাকালীন ১৮ মাসে নিয়মিত বিরতিতে পদত্যাগ সংক্রান্ত অন্তত ২৫টি অপতথ্যের শিকার হতে হয়েছে তাকে। অপতথ্য ছড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে ব্লগস্পটের ফ্রি ডোমেইন সাইটে ভুয়া সংবাদ, পুরোনো ভিডিও, ভুয়া পদত্যাগপত্র এবং ডিপফেক ভিডিও।

উপদেষ্টাদের নিয়ে অপতথ্যের ধরন

প্রায় দেড় বছরের দায়িত্বকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২১ জন উপদেষ্টাকে নিয়ে মোট ২৩১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। তাকে জড়িয়ে ছড়ানো ৬৭টি ভুল তথ্যের প্রায় ২১ শতাংশই ছড়িয়েছে ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে।

স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে জড়িয়ে ৩১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যেগুলোর প্রায় ৯৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নারী উপদেষ্টাদের মধ্যে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফরিদা আখতার, নুরজাহান বেগম এবং শারমীন এস মুরশিদকে জড়িয়ে ৩০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

তরুণ উপদেষ্টা ও অপপ্রচারের শিকার

জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম দায়িত্বে থাকাকালীন মোট ৫৬টি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছেন। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড, এআই কনটেন্ট, সম্পাদিত ছবি ও ভুয়া মন্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের নামে বাইনান্স অ্যাকাউন্টে বিপুল বিটকয়েন জমার অপপ্রচারেও যোগ দেয় ভারতীয় গণমাধ্যম।

প্রেস উইং ও রাজনৈতিক ইস্যুতে অপতথ্য

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের প্রধান শফিকুল আলমকে নিয়ে ১৮ মাসে ৩০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। অমর একুশে বইমেলায় ডাস্টবিন ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ও অপতথ্য ছড়ায়।

সরকারের সময়ে ছোট-বড় নানা ইস্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেখানে অন্তত পাঁচটি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে এমন ইস্যু ছিল ৪০টি। শরিফ ওসমান হাদি হামলা ইস্যুতে ১১৫টি, শেখ হাসিনার রায় ইস্যুতে ৭৮টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। অন্যান্য ইস্যুর মধ্যে ধানমন্ডি আগুন, সোহাগ হত্যা, গোপালগঞ্জ পদযাত্রা, হরতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে শতাধিক অপতথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।

নির্বাচনকালীন অপতথ্যের বিস্তার

নির্বাচন ঘিরে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রিউমর স্ক্যানারের এক বছরের বেশি সময়ের পর্যবেক্ষণে নির্বাচন সংক্রান্ত অন্তত ১০৭১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। তফসিল ঘোষণা পরবর্তী সময় থেকে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণাকালীন সময়ের মধ্যে অপতথ্য শনাক্ত হয় ৫৪৫টি।

অপতথ্য মোকাবিলায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ফেসবুকে একটি পেজ চালু করে, যেখানে ৭২৪টি ফ্যাক্টচেক পোস্ট করা হয়। তবে বিপুল সংখ্যক অপতথ্যের বিপরীতে প্রতিকারমূলক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। পরিসংখ্যান নির্দেশ করে, নির্বাচন কেবল ভোটের লড়াই নয়, বরং তথ্যযুদ্ধেরও একটি বড় ময়দান ছিল, যা ভবিষ্যতের জন্য সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।