পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের ভরসা লিগ্যাল এইড
পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের ভরসা লিগ্যাল এইড

রাজধানীর নিম্ন আদালত পাড়ায় সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্রে (লিগ্যাল এইড) আসা মানুষের ভিড় জানান দিচ্ছে, সমাজে পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীরা কতটা অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দপ্তরে আসা মোট সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে প্রতি চারজনের মধ্যে তিন জনই নারী।

চাঁঁদপুর থেকে এসে সকাল থেকে লিগ্যাল এইড অফিসের সামনে বসে আছেন লিলি বেগম। কোলে রয়েছে ছোট্ট একটি সন্তান। আরও এক সন্তানকে বাসায় রেখে এসেছেন নানির কাছে। তার সাথে আছেন দুজন নারী। লিলি বেগম ভারাক্রান্ত মনে জানান, তার স্বামীর সাথে ৮ বছরের সংসার। দুইটা সন্তান তাদের। কিন্তু এখন স্বামী কোনো খোঁজ খবর নেয় না। এমনকি ভরনপোষণ দেয় না। এর জন্য দু'সন্তান নিয়ে বেকায়দায় পরে আছেন লিলি বেগম। তার স্বামী শেখ সাজু আহমেদ ঢাকার চকবাজারের বাসিন্দা। স্বামীর বিরুদ্ধে ভরনপোষণ না দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আইনি সহায়তা নিতে এখানে এসে বসে আছেন। সোমবার (২৭ এপ্রিল) বেলা ১২ টার দিকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে অবস্থিত জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কার্যালয়ের সামনে ভুক্তভোগী এই নারীকে দেখা গেছে।

লিলি বেগম ছাড়াও এখানে বিভিন্ন সমস্যায় পরে আইনি সহায়তা নিতে বসে আছেন অনেকেই। এদের সিংহভাগই নারী। এদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। ঢাকার কামরাঙ্গীচর থেকে এসেছেন এক নারী। তার স্বামী অন্য কাউকে বিয়ে করে আর খোঁজ নিচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ নারী বলেন, অভাবের সংসার এমনিতেও। এই অবস্থায় শুনছি স্বামী অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছে। কোনও কূল না পেয়ে এখানে চলে এসেছি আইনি সহায়তা নিতে। দেখি কি হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভুক্তভোগী নারীদের সংখ্যা

পরিসংখ্যান বলছে, আইনি পরামর্শ নিতে আসা ৩ হাজার ৪ শো ৫৮ জনের মধ্যে ২ হাজার ৬ শো ১৩ জনই ছিলেন নারী। সমীকরণ অনুযায়ী নারী ভুক্তভোগী মোট সেবাগ্রহীতার ৭৫.৫৬ ভাগ। বাকি ২৪.২০ ভাগ (৮৩৭ জন) পুরুষ। এরমধ্যে তৃতীয় লিঙ্গ ০.২৩ ভাগ (৮ জন) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইনি সংকটে পড়া নারীরাই পুরুষদের তুলনায় ৩ গুণ বেশি সাহায্যের জন্য লিগ্যাল এইডের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

পারিবারিক মামলা ও অপরাধের চিত্র

অসহায়ত্বের এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয় মামলার ধরণ দেখলে। এক বছরে জমা পড়া ২হাজার ১৪২টি মামলার মধ্যে বিশাল একটি অংশ পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের। লিগ্যাল এইডের গত এক বছরের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক মামলা এসেছে ১ হাজার চারশো ২৬ টি। যা মোট মামলার সমীকরণে ৬৬.৫৫ ভাগ। ফৌজদারি মামলা ৩৯৬টি যা মোট মামলার ১৮.৪৮ ভাগ। দেওয়ানী মামলা ৩২০ টি যা সমীকরণে ১৪.৯৪ ভাগ। অর্থাৎ, লিগ্যাল এইডে আসা প্রতি ১০টি মামলার মধ্যে অন্তত ৭টিই পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব মামলার সিংহভাগই দেনমোহর আদায়, ভরণপোষণ বা নির্যাতনের অভিযোগ কেন্দ্রিক।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে সাফল্য

আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও মামলার জট কমাতে ২০২৫ সালে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা (এডিআর)-এ বিশেষ সাফল্য দেখা গেছে। এ সময়ে সর্বমোট ২ হাজার ৬২ টি মামলার মধ্যে, মামলাপূর্ব (প্রি কেইস) ৭৯৯টি বিরোধ সফলভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া আদালতে বিচারাধীন (পোস্ট কেইস) ১৩১টি মামলার মধ্যে ৪৪টি বিরোধ আপোষ-মীমাংসার মাধ্যমে শেষ হয়েছে। এই মধ্যস্থতার মাধ্যমেই ভুক্তভোগীরা সোয়া কোটি টাকার বেশি পাওনা বুঝে পেয়েছেন। এটি মূলত অসহায় মানুষের পাওনা, নারীদের দেনমোহর বা খোরপোশের টাকা যা দীর্ঘ আইনি লড়াই ছাড়াই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

২০২৫ সালে কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ৯৬৩ জন কারাবন্দির আইনি সহায়তার আবেদন বা মামলা লিগ্যাল এইড অফিসে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে বিভিন্ন আদালত থেকে আরও ১১৪টি মামলা আইনি সহায়তার জন্য এই দপ্তরে রেফার করা হয়েছে।

সেবাপ্রাপ্ত নারীর অভিজ্ঞতা

লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে শতভাগ আইনি সহায়তা পেয়েছেন এমন একজন নারীর সাথে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। বেসরকারি প্রজেক্টে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা ওই নারী তার স্বামীর সাথে পারিবারিক বিভিন্ন ঝামেলা নিয়ে বহুদিন আদালতে ঘুরে পরে লিগ্যাল এইডের শরণাপন্ন হন। সেখানে যাওয়ার পরে মাত্র একটি তারিখের মধ্যে গত বছরের আগস্ট মাসে পারিবারিক কলোহ থেকে নিষ্পত্তি পান। লিগ্যাল এইডের আইনজীবী ও বিচারকদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এখানকার সবাই অনেক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে। এরজন্য আমার মত যারা সেবাপ্রত্যাশি তারা খুব সহজেই তাদের সমস্যা সমাধান করতে পারেন।

আইনজীবীদের মতামত

জেলা লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুই জানান, লিগ্যাল এইড বর্তমানে একটা ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। এখানে কম সময়ে বিনা খরচে আইনি সহায়তা পাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। তার মধ্যে নারীরাই বেশি। কারণ পারিবারিক সমস্যা নারীরাই বেশি ভুক্তভোগী হয়। একপর্যায়ে তারা আইনি সহায়তার ব্যাপারে হিমশিম খায়। সেই সমস্ত মানুষদের জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে। এখানে অন্যান্য আদালতের চেয়ে কি কি সুবিধা আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে মামলার প্রাথমিক অবস্থা, বা চলমান মামলা এমনকি কারাগারে থাকা আসামিরাও সেবা পেয়ে থাকেন। যে কোনো ধরনের অসচ্ছল আসামি বিনামূল্যে আইনি সেবা পেয়ে থাকেন। এখানকার অন্যতম ব্যাপার হচ্ছে, মামলা না করেও শুধুমাত্র আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান দেওয়া হয়। এমনকি বিচারপ্রার্থীরা সরাসরি বিচারকের সাথে কথা বলে দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা করতে পারেন।

লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আরেক আইনজীবী মো. হাকিম বাহাউল হক বলেন, এখানে যারা আইনি সহায়তার জন্য আসেন তাদেরকে আমরা মামলায় না ঠেলে দিয়ে সমঝোতা করে দেই। এরপরও যারা মামলার দিকে যান তাদের খুব কম সময়ে মামলা নিষ্পত্তি করে থাকি। এখানে নারী, পুরুষ থেকে শুরু করে তৃতীয় লিঙ্গের যারা আছেন তারাও আইনি সহায়তা নিতে আসেন।

জেলা লিগ্যাল এইডের অফিস সহকারী জুবায়রা ফেরদৌসী জানান, প্রতিদিন অনেক মানুষকে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সহায়তা দিয়ে থাকি। এদের মধ্যে নারীই বেশি। এখানে দেওয়ানি, ফৌজদারী, পারিবারিক মামলা সহ বিভিন্ন ধরনের মামলার ফ্রি সেবা দেওয়া হয়। এছাড়াও এখানে আদালত থেকে প্রাপ্ত মামলার ব্যাপারেও সহায়তা দেওয়া হয়।