১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য একাধিকবার প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার ইঙ্গিত দিলেও দলগতভাবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অনুশোচনা প্রকাশ’ বা ‘ক্ষমা প্রার্থনা’ করেনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান এবং হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগে দলটির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনপরিসরে বিতর্ক রয়েছে।
সংসদে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল।’
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
এর জবাবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমরা অপরাধ করিনি, ক্ষমা চাইব কেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলেন।’ তার মতে, ‘অতীতে বিভাজনের রাজনীতির কারণে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। আবার বর্তমান সরকার সেই বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছে। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য জামায়াত ক্ষমা চায়নি। ফ্যাসিবাদীরা যে সুরে কথা বলেছে, সেটি বাংলাদেশের জনগণ জুলাই আন্দোলনের সময় রিজেক্ট (বাতিল) করে দিয়েছে। পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ হবে না।’
নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে: সাইফুল হক
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াত ইনিয়ে-বিনিয়ে বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে দলের পক্ষ থেকে একাত্তরের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি।’ তার ভাষ্য, ‘পাকিস্তানের হানাদারদের তারা রাজনৈতিক সহায়ক ছিল, সামরিক সহায়ক ছিল এবং হত্যাকাণ্ডেও তাদের সহায়ক ভূমিকার একটা প্রামাণিক ইতিহাস বা দলিলপত্র আছে, মানুষ জানে। সুনির্দিষ্টভাবে এই অপরাধের সহায়তার ব্যাপারে এবং গণহত্যার সহায়ক হিসেবে বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের যে অবস্থান, এটা যে ভুল ছিল, অন্যায় ছিল, ফলে তার জন্য যে ক্ষমা প্রার্থনা করা—এটার কোনো “যদি-কিন্তু” দেওয়া যাবে না। নিঃশর্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।’
সাইফুল হক মনে করেন, শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করলেই বিষয়টির সমাপ্তি হবে না। তার মতে, এরপর কীভাবে দলটি প্রায়শ্চিত্ত করবে, সেটিও তাদের নির্ধারণ করতে হবে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি জামায়াতেরও দল হিসেবে বিচারের প্রশ্ন রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানুষের বিচারের মুখোমুখিও তাদের হতে হবে। তার ভাষায়, ‘তাদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একাত্তরকে ধারণ করা, লালন করার একটা বিষয় আছে। এটা কেবল একটা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন না। জামায়াতের এই বিচারের প্রশ্নটা কোনো শোধ-প্রতিশোধের বিষয় না। এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন।’
শুধু ক্ষমা নয়, বিচারও হতে হবে: রুহিন হোসেন প্রিন্স
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, জামায়াতের ক্ষেত্রে শুধু ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন তুলে বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর ও আলশামস বাহিনীর মাধ্যমে যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার সঙ্গে জামায়াতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাই শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না, বিচারও চলমান রাখতে হবে। জামায়াত যদি রাজনৈতিকভাবে এই যুক্তিতে একমত হয় যে পাকিস্তানকে রাখার পক্ষে যে সংগ্রাম করেছিলাম, এইটা আমাদের ভুল ছিল—এই রাজনৈতিক উপলব্ধি হলে তখন ভুল স্বীকারের প্রশ্ন আসবে। তখন কিভাবে বলবে না বলবে সরকার এবং রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে।’
তিনি বলেন, ‘যে মনেই করে না হত্যা করেছে, জোর-জুলুম করেছে, তাহলে শুধু শুধু ক্ষমা চাইলে তো হবে না।’ রুহিন হোসেন প্রিন্স আরও বলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলে ‘উইথ দেয়ার অল অক্সিলারি ফোর্স’ উল্লেখ ছিল, যার মধ্যে আলবদর ও আলশামস অন্তর্ভুক্ত। তার মতে, সেই বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশের রাজনীতি করার অধিকার নেই। তিনি বলেন, জনগণ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত রাজনৈতিকভাবে এই শক্তিকে মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করা।
নামটাই সবচেয়ে বড় দায়: বদিউল আলম মজুমদার
রাজনীতি বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জামায়াত নামটিই দলটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দায়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াত নামটা তো ওই যে পাকিস্তানপন্থীদের পক্ষ নিয়েছে সেইরকম ইতিহাস। জামায়াত নামটা যতদিন থাকবে ততদিন তাদের এই দায় বহন করে যেতেই হবে। যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেকের বিচার হয়েছে, অনেকের শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু দল হিসেবে অতীতের দায় থেকে মুক্তি পেতে চাইলে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে।’ তার ভাষায়, ‘তাদের তো রি-ইনভেন্ট করতে হবে নিজেদের। তারা যদি একাত্তরের দায়মুক্ত হতে চায়, জামায়াত নাম যতদিন থাকবে একাত্তরের সেই দায় তারা এড়াতে পারবে না। তাদেরকে নতুন কোনো নামে আবির্ভূত হতে হবে। তাদের শুধু নাম না, তাদের কর্মসূচিও তাদের জন্য যেটা ওই যে ধর্মীয় ওগুলো তাদের জন্য এক শ্রেণির কাছে গ্রহণযোগ্য না। তবে রাজনীতি তো বিভিন্ন দল বিভিন্ন মতবাদ থাকতে পারে। কিন্তু জামায়াতের বেলায় জামায়াত নামই তাদের জন্য দায় আমি মনে করি।’
তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার কারণে জামায়াত সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে বলে মনে করেন কবি নজরুল কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াতের আমিরকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমাদের ক্ষমা করে দিন, আমাদের একটি সুযোগ দিন।’ কিন্তু তার মতে, ক্ষমা চাইতে হলে আগে স্পষ্টভাবে ভুল স্বীকার করতে হয়। সামিয়া বলেন, ‘আমি আজ পর্যন্ত কোনো জামায়াতের পক্ষ থেকে অকপটে বলতে দেখিনি বা শুনিনি যে, ১৯৭১ সালে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভুল ছিল বা তারা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থককে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস, শহীদের সংখ্যা বা যুদ্ধকালীন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। এতে মানুষের মনে ধারণা তৈরি হয় যে দলটি এখনো অতীতের অবস্থান থেকে স্পষ্টভাবে সরে আসেনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমা চাওয়ার প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার করা। আর সত্য স্বীকার না করে শুধু “ক্ষমা করে দিন” বলা রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অনুশোচনা নয়।’



