পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশ কিছু নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। যার একটি হলো, ঈদের দিনের নামাজ কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ‘রেড রোডে’ না করে কাছের ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজন করা হয়। সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে বলবৎ করা এবং রাস্তা আটকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ করার মতো বিষয়ও রয়েছে।
নামাজের স্থান পরিবর্তন
এমন পরিস্থিতিতে এবারের ঈদুল আজহা কতটা অন্যরকমভাবে উদযাপিত হয়েছে, তা নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন করেছে বিবিসি বাংলা। প্রতিবেদনে কলকাতার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে রেড রোডে নামাজ পড়তে আসতাম। আমার তখন ১০ বছর বয়স হবে। ব্রিগেড অনেক বড়। কিন্তু ঈদের সকালে রেড রোডে নামাজ পড়াটা অভ্যাসের মতো ছিল।’
ঈদুল আজহার দিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঈদের জামাত শুরু হওয়ার আগে ছায়ায় বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ও তার বন্ধু মোহাম্মদ শাহিদ। তখনই সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় বিবিসির প্রতিবেদকের।
কড়া পুলিশি নজরদারি ও আইন
খবরে বলা হয়, ঈদের দিনে কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মসজিদের বাইরে কড়া পুলিশি নজরদারির কথাও জানা গেছে। ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইনে গরু, মহিষ, ষাঁড়, বলদ ইত্যাদি পশুর জবাইয়ের জন্য বয়স ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় শংসাপত্র বা সনদ, পৌরসভা বা প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানায় পশু কাটা এবং প্রকাশ্যে জবাই না করার মতো একাধিক বিধিনিষেধের উল্লেখ আছে।
কোরবানির ঈদের আগে সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এর প্রভাব ঈদের আগে গরু বিক্রিতেও পড়বে বলে আশঙ্কা করেছিলেন অনেকে। বাস্তবেও দেখা গেছে, চলতি বছরে গরু বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। ভয়ে বা আশঙ্কায় অনেকেই এবার গরু বেচাকেনা করতে সাহস পাননি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতা—উভয় পক্ষই। একইভাবে রাস্তা আটকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন অনেকে। রাস্তায় নামাজ না পড়তে দেওয়ার বিরোধিতা জানিয়ে কলকাতায় বিক্ষোভও দেখা গিয়েছিল। এসব কিছুর মধ্যেই বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হলো কোরবানির ঈদ।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব
চলতি বছরে কলকাতায় ঈদের নামাজের অনুষ্ঠানে যেসব পরিবর্তন দেখা গেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো রেড রোডের বদলে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থানান্তর। রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও প্রায় কোথাওই রাস্তায় নামাজ পড়তে দেখা যায়নি।
বিগত তৃণমূল কংগ্রেস আমলে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে রেড রোডে ঈদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা যেত—যদিও সেটি মূলত রোজার ঈদের নামাজে, কোরবানির ঈদে নয়। অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি তাকে সেখানে রাজনৈতিক মন্তব্য করতেও শোনা যেত। এবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ঈদের নামাজে অবশ্য কোনো নেতা-মন্ত্রীকে দেখা যায়নি।
স্থানান্তরের প্রস্তুতি
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে কোরবানির ঈদের অনুষ্ঠানের জন্য আগেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ব্যক্তিদের যাতে অসুবিধা না হয়, তার জন্য ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে পর্যাপ্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকও ছিল।
নামাজ পড়তে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই এতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে রেড রোডের প্রসঙ্গ টেনে নস্টালজিয়ায় ভুগেছেন। তাদেরই একজন মোহাম্মদ সোহেল। তার কথায়, ‘আমি ঝাড়খণ্ড থেকে ২৫ বছর আগে কলকাতায় এসেছিলাম। তখন থেকেই ঈদের দিন সকালে উঠে রেড রোডে নামাজ পড়তে আসতাম।’ ‘এখানে জায়গা অনেক বেশি, বড় জমায়েত হলে সুবিধা হয়, ট্রাফিকের সমস্যা হয় না ঠিকই। কিন্তু রেড রোড থেকে ঈদের অনুষ্ঠান সরছে শুনে খারাপ লেগেছিল,’ বলেন তিনি।
তালতলার এই বাসিন্দা জানান, এ বছর তিনি বাড়ির কাছের একটি মসজিদেই নামাজ পড়েছেন। তার কথায়, ‘বুঝতে পারছিলাম না কী হবে। তাই পাড়ার মসজিদে নামাজ পড়ে নিয়েছি।’
তার মতো নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুকও ঠিক করেছিলেন বাড়ির কাছের মসজিদে নামাজ পড়বেন। তিনি বলছিলেন, ‘ব্রিগেডে দেখতে এসেছি কী হচ্ছে। যদি সবকিছু ঠিকঠাক হয়, তাহলে পরের বার আসব। এখানে বড় সুবিধা হলো নামাজের জায়গা নিয়ে ভাবতে হয় না। আগে রেড রোডে সকাল সকাল এসে জায়গা ঠিক করতে হতো। গাড়ি চলাচলেও সমস্যা হতো।’
সেনাবাহিনীর আপত্তি ও বিকল্প ব্যবস্থা
রেড রোডে নামাজ নিয়ে গত বছরই আপত্তি জানিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ব্রিগেডসহ কলকাতার এই এলাকা সেনাবাহিনীর অধীনে। পরে তখনকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হস্তক্ষেপে রেড রোডে ঈদের অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়। চলতি বছরে কলকাতা পুলিশ এই অনুষ্ঠানের আয়োজক ‘ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি’কে আগেই বিকল্প জায়গা খুঁজতে বলে।
বিপুল জমায়েতের কথা মাথায় রেখে শেষ পর্যন্ত কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডকে বেছে নেওয়া হয়। সেনাবাহিনীও এতে অনুমতি দেয়। ওই কমিটির পক্ষ থেকে মোহাম্মদ খলিল বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে রেড রোডেই নামাজ হয়ে আসছে। তার আগে মনুমেন্ট (শহীদ মিনার) সংলগ্ন মাঠে নামাজ পড়া হতো। কিন্তু সেখানে বৃষ্টির কারণে জল জমায় রেড রোডে নামাজ শুরু হয়।’
‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কম মানুষ এসেছে। অনেকে ভেবেছেন রেড রোডের বদলে নতুন জায়গায় সমস্যা হতে পারে। কেউ কেউ গরু কোরবানি দিতে পারবেন না বলে ঈদে অন্যত্র চলে গেছেন,’ বলেন মোহাম্মদ খলিল।
জনমত ও প্রতিক্রিয়া
ঈদের দিনের কথা বলতে গিয়ে অনেকে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতি’র কথা বলেছেন। হুসেন নামে পিকনিক গার্ডেনের এক যুবক বলেন, ‘নিয়ম মেনে ঈদ পালন করছি, নামাজ পড়ছি। আশা করি অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানও রাস্তা আটকে আর হবে না।’ এই পরিবর্তনের বিষয়ে কিছুই জানেন না উসমান শেখু ও তার স্ত্রী। নাইজেরিয়া থেকে আসা এই দম্পতিও বৃহস্পতিবার ব্রিগেডের নামাজে অংশ নেন। শেখু বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমি কলকাতার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিজিক্সে পিএইচডি করছি। গত তিন বছর ধরে কলকাতায় ঈদের নামাজ পড়ি। এখানে এত মানুষের জমায়েত হয়। খুব ভালো লাগে।’
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আয়োজন
মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় আসার পর কোভিডের সময় ছাড়া তাকে বিশেষ করে রোজার ঈদের অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতে দেখা গেছে। এই মঞ্চ থেকে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন, আবার রাজনৈতিক মন্তব্যও করেছেন। বেশ কয়েকবার বিরোধীদের উদ্দেশে কড়া বার্তাও দিয়েছেন, যা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। গত কয়েক বছরে তার পাশে অভিষেক ব্যানার্জিকেও দেখা গেছে।
১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট আমলে এমন নজির দেখা যায়নি। চলতি বছরে কলকাতার ঈদের আয়োজনেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দুজনেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোরবানির ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
মোটের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরেই ছিল ব্রিগেডের এই আয়োজন। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা এবং ‘ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি’র সভাপতি জাভেদ আহমেদ খান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ব্রিগেডে অনেকটা জায়গা, নিয়ম মেনেই সব ব্যবস্থা হয়েছে। সবকিছু ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে, কোনো সমস্যা নেই।’
ঈদ জামাতে অংশ নেওয়া একজনকে বিজেপিপন্থি দাবি করে কেউ কেউ রাজনৈতিক স্লোগান দিলেও আয়োজকরা এই আয়োজনকে ধর্মীয় পরিসরের মধ্যেই সীমিত রাখার জন্য অনুরোধ জানান।
পুলিশি পাহারা ও নিরাপত্তা
আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কড়া পুলিশি নজরদারি রাখা হয়। কলকাতাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের বাইরে বিপুল পুলিশ মোতায়েন ছিল। নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর জানান, তার এলাকায় মসজিদের বাইরে ব্যাপক পুলিশ নজরদারি ছিল, যা তিনি আগে দেখেননি।
তিনি বলেন, ‘শুধু পুলিশ নয়, প্রচুর সিআরপিএফ জওয়ানও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে স্থানীয় মসজিদের বাইরে মোতায়েন ছিল। এলাকায় শান্তি ছিল, তবু তাদের কেন পাঠানো হয়েছিল বুঝতে পারিনি।’
সকাল সকাল নামাজ পড়ে ছেলের সঙ্গে মল্লিক বাজারে কাজে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ হুসেন। তিনি বলেন, ‘আজ রাস্তা-ঘাটে ভিড় নেই, ট্রাফিক নেই ঠিকই, কিন্তু কিছু একটা যেন মিসিং। আগের মতো নেই।’ কেন এমন মনে হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এবার অনেক বিধিনিষেধ ছিল।’
দক্ষিণ ২৪ পরগনার খলিল আহমেদ বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখেছেন। তার কথায়, ‘সবাই নামাজ আর গরু কোরবানির কথা বলছে, কিন্তু পজিটিভ পরিবর্তনও তো আছে। এই প্রথম ঈদের নামাজের অনুষ্ঠানকে কেউ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেনি।’
অগ্নিকাণ্ডের পরিণতি
চলতি বছরের ঈদ তপসিয়ার টালিখোলা মসজিদ-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ছিল ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি ওই এলাকার একটি ভবনে আগুন লেগে চামড়ার ব্যাগ তৈরির কারখানার দুজন কর্মীর মৃত্যু ও তিনজন আহত হন। পরে অভিযোগ ওঠে, ভবনটি নিয়ম বহির্ভূতভাবে নির্মিত এবং সেখানে কারখানা চলছিল।
এরপর ওই ভবন ও পাশের ভবন ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেয় সরকার। তার আগে বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে বলা হয়। হাই কোর্টের হস্তক্ষেপে ভাঙার কাজ স্থগিত থাকলেও ওই ভবনের বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে হয়।
বর্তমানে পরিত্যক্ত ওই ভবনের নিচেই আতরের দোকান চালান মোহাম্মদ জুনেইদ। তিনি বলেন, ‘এই বাড়িতে অনেক পরিবার থাকত, তারা কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে কে জানে।’
বৃহস্পতিবার ওই এলাকায় অন্যান্য বছরের তুলনায় ভিড় কম ছিল। মোহাম্মদ জুনেইদ বলেন, ‘আগে এই রাস্তায় খুব ভিড় হতো, কিন্তু এবার লোক কম।’
রিকশাচালক এক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, ‘কিছুদিন আগেও এখানে কড়া পুলিশ পাহারা ছিল, মিডিয়া ছিল। আজ পরিবেশ শান্ত, কিন্তু যাদের মাথার ছাদ গেছে, তাদের কী হবে?’



