জামালপুরে সড়কের ইট চুরি: উদ্বোধন করে চক্রের প্রতারণা, চলাচল দুর্গম
জামালপুরে সড়কের ইট চুরি: উদ্বোধন করে প্রতারণা

জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামে গত মে মাসে এক অভিনব চুরির ঘটনা ঘটেছে। সাড়ে তিন কিলোমিটার পুরোনো ইটের রাস্তা পাকা করার নামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে পরদিন থেকেই একে একে রাস্তার সব ইট তুলে ফেলা হয়। তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। কথিত ঠিকাদার ও তার লোকজনকে এলাকায় আর দেখা যায়নি। পরে এলাকাবাসী বুঝতে পারেন, পাকা রাস্তা নির্মাণের নামে আয়োজনটি ছিল সাজানো; উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো রাস্তার ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়া।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ইট চুরি

উপজেলা সদরের ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কটি পাকাকরণের জন্য গত ১২ মে ময়নার মোড় এলাকায় উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজটি করবেন আবদুল মান্নান। পরদিন থেকেই মান্নানের লোকজন সড়কের পুরোনো ইট তুলে বিভিন্ন গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে নেন। কিন্তু সড়কের কাজ শুরু না হওয়ায় এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। পরে তাঁরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।

একই কায়দায় চাঁদপুর এলাকায় আরেকটি সড়কের ইট চুরির চেষ্টার সময় গত ১৬ জুন ওই চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গ্রেপ্তার চক্রের মূল হোতা আবদুল মান্নান (৫০)। তিনি সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের আমেছ আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন। ওই ঘটনার কয়েক দিন আগে এলাকায় ফিরে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি একজন প্রতারক বলে জানিয়েছে পুলিশ। সম্প্রতি তিনি জামিনে কারামুক্ত হয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়া

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সড়কের উন্নয়নকাজের কোনো দরপত্র হয়নি। এলাকাবাসী বিষয়টি না জানানোয় তাঁরাও সেখানে কাজ করার বিষয়টি জানতে পারেননি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন। জামালপুর সদরের ইউএনও নাজনীন আখতার বলেন, ‘উদ্বোধনের বিষয়টিও আমি জানতাম না। একদিন সংসদ সদস্য আমার কাছে জানতে চান। পরে আমি খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি, সেখানে কোনো কাজ হচ্ছে না। পরে বিষয়টি আমি সংসদ সদস্যকে জানাই। পরে প্রতারক চক্রকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করে। ওই ঘটনায় মামলাও হয়েছে।’

সড়ক পাকা করার কাজের ‘উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে’ ছিলেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন)। শুরুর দিকে কথিত ঠিকাদারের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেননি দাবি করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাস্তার উন্নয়নকাজের বিষয়টি এলাকাবাসী আমাকে প্রথমে জানান। তাঁরা সেখানে থাকতে বলায় আমি সেখানে গিয়েছিলাম। এরপর এ ঘটনার মূল হোতা আবার আমাকে আরেকটি রাস্তার কাজের বিষয়ে জানান। তখন আমি এলজিইডির প্রকৌশলীসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে রাস্তার দরপত্রের বিষয়ে জানতে চাই। তাঁরা দরপত্র না হওয়ার বিষয়টি জানালে আমার সন্দেহ হয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় লোক পাঠিয়ে খোঁজখবর নিই। পরে দলীয় নেতা-কর্মীদের দিয়ে চক্রের মূল হোতাসহ ১১ জনকে ধরে পুলিশে দিই। আমি তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়ে কারাগারে পাঠানো ব্যবস্থা করি।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ

প্রতারক চক্র রাস্তার ইট খুলে নিয়ে যাওয়ায় রশিদপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কে চলাচল করতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের কোথাও একটি ইটও নেই। পুরো সড়কটি এখন কাদাপানিতে পরিণত হয়েছে। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা কিংবা অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। অনেককে জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।

গজারিআটা গ্রামের সবুজ মিয়া ধানের বস্তাবোঝাই সাইকেল কাদার মধ্যে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিছু দূর পরপরই সাইকেলের চাকা কাদায় আটকে যাচ্ছিল। হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে এখন চলাচল করাই কষ্টকর। বর্ষা থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তা চেনারও উপায় নেই। অথচ কয়েক মাস আগেও এখানে ইটের রাস্তা ছিল। এখন কাদাপানিতে প্রতিদিনই দুর্ভোগ হচ্ছে।’

রশিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য জামিল হাসান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। বোঝার উপায় ছিল না। কারণ, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমপি সাহেব ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতিসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এমপি সাহেব আসার খবরে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করেন, এমন প্রতারণা হবে—আমরা একটুও বুঝতে পারিনি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মানুষ। কারণ, রাস্তাটি দিয়ে চলাচল করার উপায় নাই।’

আইনি ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

জামালপুরের নারায়ণপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক মো. মঞ্জুরুল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গজারিআটা গ্রামের ঘটনায় মামলা হয়নি। তবে একই কায়দায় চাঁদপুর এলাকায় ইট ওঠানোর সময় চক্রটির ১১ জনকে আটক করেন এলাকাবাসী। তাঁদের সবার বিরুদ্ধে মামলা করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তাঁরা সবাই এখন জামিনে আছেন। এ ঘটনার তদন্ত চলছে।’

বিষয়টি ফেসবুকের মাধ্যমে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন এলজিইডির জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহ্ম্মেদ। ওই রাস্তায় কোনো উন্নয়নকাজের দরপত্র হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইট না থাকায় চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই রাস্তা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেব।’