বাংলাদেশের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৭ কোটি ৭৮ লাখ, যা প্রতিবছর ১ দশমিক ২২ শতাংশ হারে বাড়ছে। ফলে বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষ যুক্ত হচ্ছে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩৬ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি হতে পারে। এই বিপুল জনসংখ্যা খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তা
বাংলাদেশের চাল উৎপাদন ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে ৯৯ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ কোটি ৬ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে, যা চার গুণের বেশি। তবে চাল এখনো আমদানি করতে হয় এবং দাম চড়া। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এক কেজি মোটা চালের দাম ৪৮ থেকে ৬০ টাকা, যা ১৯৭২ সালে ছিল প্রায় ১ টাকা ৮৫ পয়সা। মাথাপিছু জমির পরিমাণ বর্তমানে মাত্র শূন্য দশমিক ২১ একর, যা বাড়িঘর নির্মাণ ও নগরায়ণের কারণে কমছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১ শতাংশ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে এবং নদীভাঙনে প্রতিবছর ১০ হাজার হেক্টর জমি হারিয়ে যাচ্ছে। ২০৫০ সালে মাথাপিছু জমি শূন্য দশমিক ১৫ একরের নিচে নেমে আসবে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করবে।
আবাসন সংকট
জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাসন সংকট প্রকট। ইউএন হ্যাবিট্যাটের মতে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ বস্তি বা নিম্নমানের আবাসস্থলে বসবাস করেন। ২০৫০ সালে প্রায় ১২ কোটি মানুষ শহরে বাস করবে, যার মধ্যে ৪ থেকে ৫ কোটি মানুষ বাসযোগ্য নয় এমন ঘরবাড়িতে থাকবে।
স্বাস্থ্যসেবার চাপ
সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ প্রকট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন-২০২৪ অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক স্তরের প্রতিষ্ঠান থেকে দৈনিক ১ লাখ ২৮ হাজার মানুষ সেবা নেন। দ্বিতীয় স্তরের হাসপাতালে দৈনিক ২৭ হাজারের বেশি রোগী বহির্বিভাগে সেবা নেন এবং প্রতিদিন সাড়ে ৫ হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বছরে ১৭ কোটি মানুষ চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নেই।
শিক্ষা ও বেকারত্ব
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অত্যধিক, যা শিক্ষার মান কমিয়ে দিচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত আদর্শ মানের চেয়ে অনেক বেশি। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, সার্বিক বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, কিন্তু স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার। প্রতি তিনজন বেকারের মধ্যে একজন উচ্চশিক্ষিত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের যুব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব উদ্বেগজনক এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই।
বিশেষজ্ঞ মতামত
অর্থনীতিবিদ ও জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক বিশেষজ্ঞ সেলিম জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র আয়তনের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের ঊর্ধ্বগতি একটি অশনিসংকেত।’ তিনি আরও বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সংকট দেশের অর্জিত উন্নয়নকে ভঙ্গুর করে তুলবে এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্তরায় হবে। ‘সে অবস্থায় জনসংখ্যা বাংলাদেশের সম্পদ না হয়ে দায় হয়ে উঠবে,’ যোগ করেন তিনি।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে খাদ্য, আবাসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সংকট আরও গভীর হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ না করলে জনসংখ্যা দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।



