রাজনৈতিক সহনশীলতার নতুন দৃষ্টান্ত: বিএনপির ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী
বিরোধী দল জামায়াতের ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশংসিত হয়েছেন। এই ঘটনাটিকে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রকাশ হিসেবেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দলগুলোর মধ্যে সৌজন্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা যে অত্যন্ত জরুরি, তা প্রধানমন্ত্রীর এই দাওয়াত কবুলের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শিক বিরোধ ও শত্রুতার ইতিহাস
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আদর্শিক মতভিন্নতা প্রায়শই তীব্র বিরোধে রূপ নেয়, যা একসময় শত্রুতায় পর্যবসিত হয়। এই প্রবণতা গত অর্ধ শতাব্দী ধরে দেশে একটি সুস্থ ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলস্বরূপ, ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়গুলো, বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও এর সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি নিয়েও বিতর্কের অবকাশ থেকে গেছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণও এই বিতর্কের বাইরে নয়।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও দলীয় অবস্থান
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালির ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। দেশের প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও সংঘাতময় সম্পর্ক থাকলেও ৭ মার্চ ইস্যুতে তাদের মধ্যে কোনও বিভেদ থাকার কথা নয়। বিএনপির জন্ম ১৯৭৫ সালের পরে হলেও এই দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একজন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের দর্শনগত পার্থক্য থাকার যুক্তি নেই।
তবে বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে এই দুটি দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সাধারণ সৌজন্যমূলক কথাবার্তা ও দেখাসাক্ষাৎও বন্ধ হয়ে যায়। ২০২১ সালে বিএনপি প্রথমবারের মতো স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ৭ মার্চ পালন করে, যদিও আওয়ামী লীগের ভেতরে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিএনপি নেতারা ঐতিহাসিক এই ভাষণকে স্বীকৃতি দিলেও তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনাও করেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
২০২৩ সালে বিএনপি ৭ মার্চ উপলক্ষে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করলেও ২০২৪ সালে এবং গত বছর এই দিবসে তাদের কোনও কর্মসূচি চোখে পড়েনি। এখন বিএনপি সরকারি দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে, তাই তাদের সহনশীলতা ও আন্তরিকতা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হওয়া প্রয়োজন। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ এখন জামায়াতে ইসলামী, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ঐতিহাসিক সত্যগুলো নিয়েও ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক প্রমাণ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে এড়িয়ে যায়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানের অবদানকে অস্বীকার করে। এই বিভেদ তৃতীয় পক্ষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার অপরিহার্যতা
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন, এবং এটি কোনও একটি দলের একক সম্পত্তি নয়। ৭ মার্চ, ২৫ ও ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অভিন্ন অবস্থান থাকা আবশ্যক। মুক্তিযুদ্ধের একটি অভিন্ন ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করা না গেলে দেশের রাজনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিভক্তি দেশকে পিছিয়ে রাখতে পারে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে শঙ্কা থাকলেও নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণে তা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। তবে রাজনৈতিক মতভিন্নতার নামে শত্রুতার চর্চা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরেকটি অস্থিতিশীলতার পটভূমি তৈরি হতে পারে। তাই রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এনে ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে স্বীকার করে জাতীয় ঐক্য স্থাপনের কোনও বিকল্প নেই।
