সম্প্রতি ছয় কিশোরের নিছক কৌতূহল থেকে মানুষ খুনের পৈশাচিক ঘটনাটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। আধুনিক মনস্তত্ত্ব এবং মেটামোরালিটি বা ‘উচ্চতর নৈতিকতা’র দর্শনের আলোকে এই সংকট বিশ্লেষণ করলে আমাদের সতর্ক হওয়ার প্রধান জায়গাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে শেখানো
আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুদের শেখায় ‘কী করতে হবে’, কিন্তু শেখায় না ‘কেন করতে হবে’। মেটামোরালিটির মূল শিক্ষা হলো—কোনও কাজ করার আগে তার সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। এই কিশোরদের মধ্যে সেই বিচারবুদ্ধি বা ‘লজিক্যাল ফিল্টার’ একেবারেই তৈরি হয়নি। তারা কেবল নিজেদের একটি তাৎক্ষণিক ইচ্ছা বা কৌতূহল পূরণকেই প্রাধান্য দিয়েছে, যার ফলে একটি অমূল্য জীবনের বিনিময়ে তারা সস্তা অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে চেয়েছে।
সন্তান হোক সহমর্মী
আমাদের বর্তমান সামাজিক কাঠামো শিশুদের তাদের স্বাভাবিক আবেগ (রাগ, দুঃখ বা একঘেয়েমি) প্রকাশ করতে না শিখিয়ে বরং তা দমন করতে শেখায়। ফলে কিশোররা নিজেদের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে এবং ধীরে ধীরে অন্যের কষ্ট বোঝার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। মেটামোরালিটির দর্শন অনুযায়ী, একজন মানুষকে তার মনের অন্ধকার ও আলোকিত—উভয় দিককেই চিনতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাতে হয়। তা না হলে তারা একসময় সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন হয়ে অন্যের জীবন নিয়ে খেলতে দ্বিধা করে না।
নানা ধরনের কাজে যুক্ত করাআজকের প্রজন্মের কিশোররা স্থিরতা বা একঘেয়েমি একদমই সহ্য করতে পারে না
তারা সবসময় নতুন কোনো উত্তেজনা বা চরম অভিজ্ঞতার খোঁজে থাকে। জীবন যে সবসময় রোমাঞ্চকর হবে না—এই সাধারণ সত্যটি তারা গ্রহণ করতে পারছে না। ফলে সাধারণ জীবনে আনন্দ না পেয়ে তারা খুনের মতো চরম অপরাধের মাধ্যমে এক ধরনের বিকৃত রোমাঞ্চ বা ‘থ্রিল’ অনুভব করতে চাইছে।
জীবন ভিডিও গেম নয়
ভার্চুয়াল জগতের প্রভাবে কিশোরদের কাছে অনেক সময় বাস্তব জীবনের গুরুত্ব ফিকে হয়ে যায়। তারা জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে ‘গেম’-এর মতো মনে করে, যেখানে কোনো ভুল করলে আবার ‘রিস্টার্ট’ দেওয়া যায়। কিন্তু মেটামোরালিটি শেখায়—জীবন কোনো সাজানো বাগান নয়, বরং এটি একটি জটিল বুনন বা এমব্রয়ডারির মতো, যার উল্টো পিঠে জট থাকবেই। এই জট বা জীবনের রূঢ়তাকে গ্রহণ করতে না পারার কারণেই তারা জীবনকে অতি তুচ্ছ মনে করছে।
সর্বোপরি, আমাদের সতর্ক হতে হবে এখানেই যে—আমরা কি কেবল জিপিএ-৫ পাওয়া মেধা তৈরি করছি, নাকি একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তৈরি করছি? কিশোরদের হাতে প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে যদি নৈতিকতার এই ‘মেটামোরালিটি’ বা উচ্চতর বিচারবুদ্ধি তুলে দেওয়া না হয়, তবে কেবল আইন দিয়ে এই ধরনের ভয়াবহ অপরাধ থামানো সম্ভব হবে না।



