গত বছরের ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট রেঞ্জের কয়লাঝিলতলী এলাকায় বন বিভাগের অভিযানে বালুদস্যুদের ট্রাকচাপায় গুরুতর আহত হন রেঞ্জ সহযোগী কর্মকর্তা তারিকুর রহমান (৪৮)। এখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি। চিকিৎসায় প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যার বড় অংশ জোগাড় করতে হয়েছে স্ত্রীর গয়না বিক্রি ও ধারদেনা করে। বন বিভাগের কল্যাণ তহবিল থেকে মাত্র দুই লাখ টাকা অনুদান পেয়েছেন তিনি।
ঘটনার বিবরণ
সেদিন রাত ৯টায় দুর্গম পাহাড়ি বনে টর্চলাইটের আলো জ্বালাতেই ধরা পড়ে বালুভর্তি একটি ট্রাক। বালু বনের ছড়া থেকে অবৈধভাবে তোলা হয়েছিল। বন কর্মকর্তারা ট্রাকটি থামার জন্য সংকেত দেন এবং একজন সামনে দাঁড়ান। কিন্তু ট্রাক থামেনি; উল্টো তারিকুর রহমানকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায় চালক। সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাহাদী হাসানের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি দল অভিযানে ছিল। দলের সঙ্গে একটি চায়নিজ রাইফেল ও দুটি শটগান ছিল।
ট্রাকচাপায় তারিকুরের ঊরুর হাড় ভেঙে যায়। তিনি সড়কের পাশের জমিতে ছিটকে পড়েন এবং পরদিন হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে। ট্রাকটি কিছু দূর গিয়ে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে আটকে যায়। চালক পালিয়ে গেলেও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করা হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মামলা ও জামিন
ঘটনার পরদিন রেঞ্জের ফরেস্টার ও স্টেশন কর্মকর্তা মোনায়েম হোসেন বাদী হয়ে বন আইনে একটি মামলা করেন। মামলায় মো. নুর উদ্দিন (৪৮) ও মো. আবদুল নামের দুজনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। তবে গ্রেপ্তার দুজন আসামিই এখন জামিনে মুক্ত।
চিকিৎসা ব্যয় ও পারিবারিক অবস্থা
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দা তারিকুর রহমান। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ। ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাসের পর ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রিতে ভর্তি হন এবং ২০০৩ সালে কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০০৪ সালের নভেম্বরে বন বিভাগে যোগ দেন। আড়াই বছর আগে মিরসরাইয়ের করেরহাট রেঞ্জে যোগ দেন এবং পদ শূন্য থাকায় কিছু সময় ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেন।
তারিকুরের স্ত্রী শাহিনুর আক্তার গৃহিণী। তাঁদের দুই ছেলে আহনাফ শাহরিয়ার ও ইয়ানুর রহমান স্কুলে পড়াশোনা করছে। পরিবার নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। গ্রামের বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্বও তাঁর ওপর।
তারিকুর রহমান বলেন, ‘এখন চিকিৎসার খরচ, সন্তানের লেখাপড়া, বাসাভাড়া ও সংসারের নিত্য খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। আমি চাই, আমার এই দুঃসময়ে বন বিভাগ পাশে দাঁড়াক।’
বন বিভাগের অবস্থান
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও উপবন সংরক্ষক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘আমি সম্প্রতি অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করলে বিভাগীয়ভাবে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যায়, তা দেখা হবে। বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবরও নেব।’



