বাংলাদেশের প্রতিটি বিসিএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর একটি দৃশ্য প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে: মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করা একজন চিকিৎসক কিংবা বুয়েট থেকে বেরিয়ে আসা একজন প্রকৌশলী শেষ পর্যন্ত যোগ দিচ্ছেন প্রশাসন বা পররাষ্ট্র ক্যাডারে। বিষয়টি ব্যক্তিপর্যায়ে সহজ ও স্বাভাবিক মনে হলেও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি একটি গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। যে রাষ্ট্র বছরের পর বছর সরকারি অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করে একজন চিকিৎসক বা প্রকৌশলী তৈরি করে, সেই রাষ্ট্রই যখন তার সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এই অপচয়ের দায় কার?
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ব্যক্তির পছন্দের দ্বন্দ্ব
একজন শিক্ষার্থী যখন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন, তখন রাষ্ট্র তাঁর পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে। ভর্তুকিমূল্যে শিক্ষা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকমণ্ডলী, হাসপাতালের অবকাঠামো, ল্যাবরেটরি সুবিধা—সবকিছুর পেছনেই থাকে করদাতার টাকা। পাঁচ-ছয় বছরের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে যখন তিনি প্রস্তুত হন মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য, ঠিক তখনই তিনি বেছে নেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পেশা। একই কথা প্রযোজ্য প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেও। রাষ্ট্রের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য যাঁদের নিয়োজিত হওয়ার কথা, তাঁরাই যখন ফাইলপত্র সামলানো আর প্রশাসনিক দায়িত্বে মনোনিবেশ করেন, তখন দেশের প্রকৌশল খাত মেধাশূন্য হয়ে পড়ে।
সামাজিক কাঠামো ও চাকরির বাজারের প্রভাব
এর পেছনে দায় শুধু ব্যক্তির নয়। আমাদের সামাজিক কাঠামো এবং চাকরির বাজার এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে বিসিএস ক্যাডার হওয়াকে সবচেয়ে সম্মানজনক ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সরকারি চাকরির সামাজিক মর্যাদা, চাকরির নিশ্চয়তা, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং তুলনামূলক ভালো বেতন-ভাতা তরুণদের এই পথে টানে। অন্যদিকে একজন সরকারি চিকিৎসকের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি, নিম্নমানের কর্মপরিবেশ, কিংবা একজন প্রকৌশলীর বেসরকারি খাতে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—এসব বাস্তবতা তাদের নিজের পেশা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
বহুমুখী ক্ষতি: স্বাস্থ্য, প্রকৌশল ও মানবসম্পদের অপব্যবহার
এই প্রবণতার ফলাফল রাষ্ট্রের জন্য বহুমুখী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমত, স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ চিকিৎসকের সংকট তৈরি হয়, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায়। দ্বিতীয়ত, প্রকৌশল খাতে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মেধার অভাবে দেশীয় প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন বিদেশিনির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। তৃতীয়ত, যিনি প্রশাসনে যোগ দিচ্ছেন, তিনিও প্রকৃতপক্ষে নিজের প্রশিক্ষিত দক্ষতা কাজে লাগাতে পারছেন না—একজন দক্ষ সার্জন যখন ভূমি অধিগ্রহণের ফাইল দেখেন, তখন তার বছরের পর বছরের প্রশিক্ষণ কার্যত অব্যবহৃত থেকে যায়। এটি জাতীয় পর্যায়ে মানবসম্পদের একটি স্পষ্ট অপব্যবহার।
টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা
কোনো রাষ্ট্র তখনই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে, যখন প্রত্যেক পেশাজীবী তাঁর নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষতা বিকশিত করার সুযোগ পান এবং সেই ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখেন। উন্নত বিশ্বে একজন চিকিৎসক সারা জীবন চিকিৎসাবিজ্ঞানেই গবেষণা ও সেবা দিয়ে যান, একজন প্রকৌশলী তাঁর নির্দিষ্ট খাতে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। এই ধারাবাহিকতাই একটি জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের দেশে যদি প্রতিটি খাতের মেধাবীরাই শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের দিকে ছুটতে থাকেন, তাহলে নির্দিষ্ট খাতে গভীর দক্ষতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান গড়ে ওঠার সুযোগই তৈরি হয় না।
সমাধানের পথ: কাঠামোগত সংস্কার ও মানসিকতার পরিবর্তন
এই সমস্যার সমাধান কোনো একক পদক্ষেপে সম্ভব নয়। প্রয়োজন পেশাভিত্তিক কাঠামোগত সংস্কার—চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের জন্য আকর্ষণীয় বেতনকাঠামো, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উন্নয়নের স্পষ্ট সিঁড়ি এবং সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। পাশাপাশি প্রয়োজন এই মানসিকতার পরিবর্তন যে শুধু প্রশাসনিক চাকরিই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। যত দিন না রাষ্ট্র তার বিশেষজ্ঞ জনশক্তিকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে ধরে রাখার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, তত দিন এই মেধা পাচার দেশের ভেতরেই এক খাত থেকে আরেক খাতে থামানো কঠিন হবে। আর যত দিন এই প্রবণতা চলবে, তত দিন প্রকৃত অর্থে একটি রাষ্ট্রের সুষম ও টেকসই উন্নয়ন কল্পনা করাও কঠিন।
লেখক: রিফাত রহমান, শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়



