সাইপ্রাসে শিক্ষার্থী ভিসায় পড়তে গিয়ে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন নরসিংদীর রায়পুরার শাহরিয়ার আহমেদ ওরফে ইমন (২২)। নিখোঁজের ১০ দিন পর তার হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে শাহীন বাবু (২২) নামে এক বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করেছে সাইপ্রাস পুলিশ। অপহরণকারীরা তাকে হত্যার পর লাশ গুমের চেষ্টা চালায়।
শাহরিয়ারের পরিচয় ও সাইপ্রাস যাত্রা
নিহত শাহরিয়ার আহমেদ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার উত্তরবাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির মিয়ার ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিন মাস আগে শিক্ষার্থী ভিসায় দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসে যান তিনি। সাইপ্রাসের লারনাকা শহরের ওরোক্লিনি এলাকায় তার রুমমেট ছিলেন একই গ্রামের প্রতিবেশী রায়হান।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন আগে সাইপ্রাসে পৌঁছান শাহরিয়ার। সেখানে যাওয়ার আগেই তিনি অনলাইনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে তার খরচ বাবদ পরিবারকে প্রতিমাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাঠাতে হতো। পরিবারের ওপর চাপ কমাতে তিনি কাজের সন্ধান শুরু করেন এবং একপর্যায়ে কাজও পান।
অপহরণের ঘটনা ও মুক্তিপণের দাবি
গত ১১ জুন মায়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলে শাহরিয়ার জানান, তার কাজের ব্যবস্থা হয়েছে এবং সেই রাত থেকেই তার ডিউটি শুরু হবে। বিষয়টি তিনি প্রবাসী বাবা ও রুমমেট রায়হানকেও জানিয়েছিলেন। রায়হান তাকে কর্মস্থলে পৌঁছে লোকেশন পাঠাতে বলেন। স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে কর্মস্থলে পৌঁছে শাহরিয়ার হোয়াটসঅ্যাপে রায়হানের কাছে লোকেশন পাঠান। কিছুক্ষণ পর রায়হান ‘ওকে’ লিখে জবাব দিলেও সেই বার্তা আর দেখেননি শাহরিয়ার।
কিছুক্ষণ পর রাত ১০টার দিকে শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকেই তার বাবা নাসির মিয়ার কাছে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছি। তাকে ফিরে পেতে ৩৫ হাজার ইউরো দিতে হবে। না দিলে তার চোখ ও কিডনি বিক্রি করে দেওয়া হবে।’
নিখোঁজ ডায়েরি ও তদন্ত
প্রথমে সবাই ধারণা করেছিলেন, হয়তো শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ আইডি হ্যাক হয়েছে। কিন্তু পরদিন ১২ জুন সকালে তিনি আর বাসায় ফেরেননি। এ অবস্থায় রায়হান স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে নিখোঁজ ডায়েরি করেন। পুলিশকে নিয়ে লোকেশনেও খোঁজ করা হলেও শাহরিয়ারের সন্ধান মেলেনি। এদিকে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ২৪ ঘণ্টাই সচল ছিল এবং পরিবারের কাছে প্রতিদিন মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছিল।
শাহরিয়ারের ছোট ভাই নয়ন আহমেদ জানান, কোনো খোঁজ না পেয়ে একপর্যায়ে তারা মুক্তিপণের টাকা দিতে রাজি হন। অপহরণকারীদের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশি অর্থে পাঁচ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়। তিনি বলেন, “রোববার (২১ জুন) দুপুরে চুক্তি অনুযায়ী টাকা পাঠাতে ব্যাংকে যাই। সেখানে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিই, ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েই টাকা পাঠাব। অপহরণকারীদের কাছে থাকা আমার ভাইয়ের মোবাইল ফোন দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। কিন্তু তাদের কথাবার্তা ও আচরণে সন্দেহ হওয়ায় টাকা না দিয়ে ফিরে আসি। পরে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি অফলাইনে চলে যায়।”
গ্রেফতার ও লাশ উদ্ধার
ওই রাতেই জানতে পারেন, সাইপ্রাস পুলিশ শাহীন বাবু নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি জঙ্গল থেকে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা ভাইয়ের লাশ উদ্ধার করেছে। তবে গ্রেফতার হওয়া শাহীন বাবুর বাড়ি বাংলাদেশের কোন এলাকায়, সে বিষয়ে কোনো তথ্য সাইপ্রাস পুলিশ জানায়নি।
এ বিষয়ে রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বলেন, “সাইপ্রাসে এক শিক্ষার্থী অপহরণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন বলে শুনেছি। এ ঘটনায় একজন বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করেছে সেখানকার পুলিশ। তবে বিষয়টি সাইপ্রাস দূতাবাস থেকে এখনো আমাদের জানানো হয়নি। নিহতের পরিবারও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তারা সহযোগিতা চাইলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”



