রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পর্যবেক্ষণে। ইউজিসির নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিজ্ঞান অনুষদে শিক্ষক হতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৬০ প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা না মেনে সিজিপিএ ৩.২৫ নির্ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত সেই শর্তও শিথিল করে এর চেয়েও কম সিজিপিএধারী প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগে শর্ত শিথিল ও নিয়মভঙ্গ
ইউজিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কমিশনের অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ নির্দেশিকা অনুসরণ না করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ পাওয়া মুহাম্মদ ফারুক রহমানের স্নাতকে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.২৫ ছিল না। অন্যদিকে, সহকারী অধ্যাপক পদে পিএইচডি ডিগ্রিসহ বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে এক বছরের সক্রিয় শিক্ষকতা বা গবেষক হিসেবে অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইউজিসি দেখতে পেয়েছে, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগে আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগে জি এম সেলিম আহমেদকে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যদিও তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল না।
পদবদল করে নিয়োগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে এক পদের বিপরীতে অন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে মো. আবদুল হালিমকে প্রভাষক পদে, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগে অধ্যাপক পদের বিপরীতে মো. মতিউর রহমান চৌধুরীকে সহযোগী অধ্যাপক পদে, একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে মুহাম্মদ ফররুখ রহমানকে প্রভাষক পদে এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক পদের বিপরীতে মুহাম্মদ জামশেদ আলম পাটওয়ারীকে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইউজিসির মতে, এটি নিয়মভঙ্গ। ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল নিয়োগে আটটি শর্ত দিয়েছিল ইউজিসি, যার মধ্যে একটি ছিল অনুমোদিত পদ ছাড়া, পদ পরিবর্তন বা উচ্চতর পদের বিপরীতে নিম্নতর পদে কোনো জনবল নিয়োগ করা যাবে না।
উপাচার্যের গাড়িতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ
ইউজিসির পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের জন্য জ্বালানি প্রাপ্যতা নির্ধারিত ছিল মাসে ২০০ লিটার, যার মূল্য ২৪ হাজার টাকা। কিন্তু উপাচার্যের ব্যবহৃত পাজেরো জিপের জন্য বছরে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৫৩ টাকা খরচ হয়েছে, যা প্রাপ্যতার চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, দাপ্তরিক কাজে প্রায় প্রতি মাসে ঢাকায় আসা-যাওয়ার কারণে জ্বালানি বেশি খরচ হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া ও পর্যবেক্ষণ
এ বিষয়ে উপাচার্য আতিয়ার রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা ইউজিসিতে ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়েছি।’ ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি জনসংযোগ শাখার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সভাপতি ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত শিথিল করে শিক্ষক নিয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি একটি গর্হিত কাজ। এক পদের বিপরীতে আরেক পদে নিয়োগ ঠিক হয়নি। এটি একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, তাই শুরুতেই এভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে শিক্ষক নিয়োগ ঠিক হয়নি। একবার যদি এ ধারা শুরু হয়, ভবিষ্যতেও বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে।’
উল্লেখ্য, গত বছরের ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমানকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাঁর আমলে গত বছরের জুনে ২২ জন এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৭ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রথম দফায় নিয়োগ পাওয়া ২২ জনের মধ্যে ৭ জনের বিষয়ে নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে বলে ইউজিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।



