সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার খোবাইব হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনে আদালতে তোলা হয়। চার ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষার পর শুনানি শেষে এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালতে তোলা ও অপেক্ষা
শনিবার সকাল ১১টার দিকে হাজতখানা থেকে এবিএম খায়রুল হককে পুলিশি পাহারায় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে হুইলচেয়ারে করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হকের আদালতে তোলা হয়। কয়েকজন পুলিশ সদস্য হুইলচেয়ারের হাতল ধরে সিঁড়ি দিয়ে তাকে এজলাসে নিয়ে যান।
এদিন আদালতকক্ষ ছিল আইনজীবীতে পরিপূর্ণ। এসময় তীব্র গরমে সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকে অস্বস্তিতে দেখা যায়, ফ্যান চললেও কয়েকজন আইনজীবী ফাইল দিয়ে তাকে বাতাস করছিলেন। এজলাসে বিচারক উপস্থিত না থাকায় প্রায় পৌনে ১ ঘণ্টা হুইলচেয়ারে অপেক্ষা করার পর কোনো শুনানি ছাড়াই তাকে আবার হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
দ্বিতীয়বার শুনানি ও আদেশ
পরে দুপুর ৩টার দিকে আবার আদালতে তোলা হলে প্রায় আধা ঘণ্টা শুনানি শেষে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার আবেদন মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোনায়েম নবী শাহীন গ্রেপ্তারের বিরোধিতা করেন। খায়রুল হকের পক্ষে আরও শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার শামীম হায়দার চৌধুরী।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি
রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী গ্রেপ্তার আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি আদালতে বলেন, ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যার পেছনে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে, এমন তথ্য বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে। এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তে খায়রুল হকের সম্পৃক্ততা উঠে এসেছে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা হয়েছিল এবং সে কারণে তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়।
আসামিপক্ষের জবাব
জবাবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে বলেন, ৮১ বছর বয়সী খায়রুল হক আন্দোলন দমাতে রাস্তায় নামার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তিনি সবসময় পুলিশ পাহারায় থাকতেন। ফলে ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার প্রশ্নই আসে না। এছাড়া আপিল বিভাগ থেকে তিনি সাতটি মামলায় জামিন পেয়েছেন এবং তাকে হয়রানি না করার নির্দেশও রয়েছে বলে আদালতকে জানান তারা।
আগের ঘটনা
এর আগে গত ১৬ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক মো. ইব্রাহিম খলিল এই মামলায় খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আদালত তার উপস্থিতিতে শুনানির জন্য শনিবার দিন ধার্য করেছিলেন।
আবেদনে বলা হয়, মামলার তদন্তে খায়রুল হকের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া খোবাইব (২০) যাত্রাবাড়ী ওভারব্রিজের নিচে অবস্থানকালে পুলিশ, র্যাব, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গুলিতে নিহত হন। নিহতের ভাই জোবায়ের আহম্মেদ গত বছরের ১৬ নভেম্বর মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও ওবায়দুল কাদেরসহ ৮০ জনকে আসামি করা হয়।
এর আগে গত ১৭ মে হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখাতে ও হয়রানি না করতে নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, পৃথক পাঁচ মামলায় জামিন পাওয়ার পর গত ৩০ মার্চ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানার দুটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ১৩ মে তার ছেলে আইনজীবী আশিক উল হক রিট আবেদন করেন।
গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।



