গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে একটি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ক্যাশ টেবিলের ড্রয়ার ভেঙে লাখ টাকার বেশি নগদ টাকা চুরির আলোচিত ঘটনার মাত্র সাত দিনের মাথায় আবারও চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে সেই ১১ বছর বয়সী শিশুটি। স্থানীয়দের হাতে আটক হওয়ার পর দাদি ও স্বজনদের মাধ্যমে তাকে সাদুল্লাপুরে এনে বণিক সমিতির সভাপতির উপস্থিতিতে থানায় পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বয়স কম হওয়ায় তাকে কারাগারে পাঠানোর সুযোগ নেই। তাই প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে রংপুর অথবা যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (সংশোধনাগার) পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার রাতে পুলিশের কাছে হস্তান্তর
শুক্রবার (১০ জুলাই) রাতে সাদুল্লাপুর বণিক সমিতির সভাপতি শফিউল ইসলাম স্বপনের উপস্থিতিতে শিশুটিকে সাদুল্লাপুর থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় তার দাদি, ফুপাতো ভাই ও স্থানীয় কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে শুক্রবার বিকালে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মাওলানা ভাসানী সেতু এলাকায় একটি ফুচকার দোকানে ঢুকে টাকা চুরির সময় স্থানীয়রা তাকে হাতেনাতে আটক করেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় সে নিজের পরিচয় গোপন করে সুন্দরগঞ্জে বসবাসকারী এক ফুপাতো ভাইয়ের পরিচয় দেয়। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে শিশুটিকে তার দাদি ও ফুপাতো ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দাদির অনুরোধে আইনি ব্যবস্থা
ঘটনার পর শিশুটির বৃদ্ধ দাদি বণিক সমিতির সভাপতি শফিউল ইসলাম স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। পরে রাত ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে নিয়ে সাদুল্লাপুর বাজারে স্বপনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসেন। খবর পেয়ে এসআই সাইদুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাকে থানায় নিয়ে যায়।
আটক শিশুটির নাম লোকমান মিয়া (১১)। তার বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের সরকারি ডিগ্রি কলেজপাড়া এলাকায়। সে দাদা গফ্ফার মিয়ার বাড়িতে থাকতো। সম্প্রতি সাদুল্লাপুর শহরের চৌমাথা মোড়ের একটি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে সংঘটিত আলোচিত চুরির সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সে আত্মগোপনে ছিল।
একাধিক চুরির অভিযোগ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে শহর ও আশপাশে সংঘটিত একাধিক চুরির ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সাদুল্লাপুর থানার এসআই আবু তালেব বলেন, একাধিক চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত শিশুটিকে তার দাদা-দাদির উপস্থিতিতে সাদুল্লাপুর বণিক সমিতির সভাপতির মাধ্যমে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। বয়স মাত্র ১০-১১ বছর হলেও তার চুরির কৌশল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও বিস্ময়কর। সুযোগ পেলেই সে দোকান ও বাসাবাড়িতে ঢুকে চুরি করতো বলে অভিযোগ রয়েছে। আলোচিত হোটেলে চুরির পুরো ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে। ফুটেজে দেখা গেছে, প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে সে ধীরস্থির ও নির্ভীকভাবে হোটেলের ভেতরে অবস্থান করে ক্যাশ টেবিলের ড্রয়ার ভেঙে টাকা চুরি করেছে। শুধু তাই নয়, চুরির সময় হোটেলের মিষ্টি ও কোমল পানীয়ও খেয়েছে। ফুটেজ বিশ্লেষণে স্পষ্ট, এত অল্প বয়সেও সে অত্যন্ত পরিকল্পিত ও কৌশলীভাবে চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে।
সংশোধনাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত
তিনি আরও বলেন, বয়স কম হওয়ায় তার বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করে কারাগারে পাঠানোর সুযোগ নেই। তাই সমাজসেবা অধিদফতরের গাইবান্ধা জেলা শিশু সুরক্ষা প্রবেশন কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবারের মধ্যেই তাকে রংপুর অথবা যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (সংশোধনাগার) পাঠানো হবে।
পুলিশ জানায়, শিশুটির মা ক্যান্সারে মারা যাওয়ার পর তার বাবা উজ্জ্বল মিয়া দ্বিতীয় সংসার গড়ে চট্টগ্রামে চলে যান। সেখানে বাবার সঙ্গে থাকাকালেও সে চুরির ঘটনায় জড়িয়ে পড়লে তাকে দাদির কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু সাদুল্লাপুরে এসেও তার বিরুদ্ধে একের পর এক চুরির অভিযোগ ওঠে। কয়েক বছর ধরে দাদা-দাদির কাছে বড় হলেও ধীরে ধীরে সে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দাদা-দাদির কোনও কথাই সে শুনতো না। মাঝেমধ্যে বাড়িতে এলেও রাতে থাকতো না; অধিকাংশ সময় বাইরে কাটিয়ে ধারাবাহিকভাবে চুরির ঘটনায় জড়িয়ে পড়তো।
পূর্বের ঘটনা ও সমালোচনা
পুলিশের তথ্যমতে, এর আগেও তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে দাদির জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। পুনরায় একাধিক চুরির অভিযোগ ওঠায় এবার তার সংশোধন, পুনর্বাসন ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাদুল্লাপুর বণিক সমিতির সভাপতি শফিউল ইসলাম স্বপন বলেন, ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই চুরির সঙ্গে জড়িত। মা মারা যাওয়ার পর বাবার তদারকি না থাকায় সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কয়েক দিন আগে চুরির চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়লেও তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপরই সে আলোচিত হোটেল চুরির ঘটনা ঘটায়। আগেই যদি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে হয়তো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। বয়স কম হলেও সে চুরিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই শাস্তির পাশাপাশি তার পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং ও মানসিক সংশোধন নিশ্চিত করা জরুরি।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার গভীর রাতে সাদুল্লাপুর শহরের একটি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পেছনের টিন কেটে ভেতরে ঢুকে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করে ক্যাশ টেবিলের ড্রয়ার ভেঙে লাখ টাকার বেশি নগদ অর্থ চুরি করে। পুরো ঘটনাটি সিসিটিভিতে ধারণ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এরও দুই দিন আগে সাদুল্লাপুর বাজারের একটি পাঁচতলা ভবনের পাশের একটি বাসায় চুরির চেষ্টা চালানোর সময় স্থানীয়রা তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে সমাজসেবা অধিদফতরের জেলা প্রবেশন কর্মকর্তার মাধ্যমে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলে আবারও আলোচিত হোটেল চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শিশুটিকে সংশোধনাগারে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে পুলিশ ও সমাজসেবা বিভাগের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।



