পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটের দুই বছরে কোটি টাকার কোম্পানি
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটের দুই বছরে কোটি টাকার কোম্পানি

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষে সবাই যখন সরকারি চাকরির পেছনে দৌড়ান, তখন হিমেল আয়ত্ত করেছেন নতুন নতুন স্কিল। তার সেই আলাদা স্কিল তাকে দুই বছরে গড়ে দিয়েছে কোটি টাকার কোম্পানি। ২০২৪ সালে শুরু করা ‘লা অর্গানিকা লিমিটেড’ এখন প্রায় ৬০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। ৫ হাজার স্কয়ার ফিটের অফিস ও কারখানায় উৎপাদন ও সরবরাহ হচ্ছে নিজস্ব পণ্য।

চাকরি ছেড়ে ব্যবসায়

ইলিয়াছ হিমেল অভিজ্ঞতার জন্য প্রাইভেট কোম্পানিতে জয়েন করার তিন মাসের মাথায় চাকরিটি ছেড়ে দেন। কারণ ছিল এটি সীমিত আয়ের উৎস। বড় হতে হলে, সম্পদ অর্জন করতে হলে, ব্যবসা করতে হবে। পরিবারের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সেটি উপেক্ষা করে শুরু করেন ফুড ও নিউট্রিশন পণ্য নিয়ে ব্যবসা। সেটি শুরুর পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নেটওয়ার্কিং দক্ষতা, ডিজিটাল মার্কেটিং, হিউম্যান সাইকোলজি, হিউম্যান ম্যানেজমেন্ট তার সামনে এগিয়ে যেতে, কোম্পানির ভিত্তি গড়তে সহযোগিতা করেছে।

ছাত্রজীবন থেকেই উদ্যোক্তা

ইলিয়াছ হিমেলের ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই। যখন অন্যরা ভবিষ্যতের চাকরির স্বপ্ন দেখেছিলেন, তখন তিনি খুঁজছিলেন কীভাবে নিজের জন্য আয়ের উৎস তৈরি করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন নানা ধরনের ব্যবসা করে অভিজ্ঞতা নেয়ার চেষ্টা করেছেন। সুপার শপ, ইমপোর্টেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্ট, ফ্যাশন আইটেমসহ নানা ধরনের ব্যবসা থেকে অভিজ্ঞতা নিয়েছেন ইলিয়াছ। ২০২৪ সালে তিনি শুরু করেন লা অর্গানিকা নামক ফুড ব্র্যান্ড। যেখানে সকল নিরাপদ ও প্রাকৃতিক খাদ্যপণ্য মান বজায় রেখে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোই মূল লক্ষ্য ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম দিকের চ্যালেঞ্জ

প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা ছিল কঠিন। প্রথমে ব্যবসায় বড় ধরনের লস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে, ব্যবসা মানে শুধু পণ্য বিক্রি নয়, এটি একটি সিস্টেম। এই ব্যর্থতাই তার মানসিকতা বদলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, টাকা হারানো সমস্যা নয়, শেখার সুযোগ হারানোই আসল সমস্যা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাকৃতিক খাদ্যে সম্ভাবনা

কেন ন্যাচারাল ফুড ও নিউট্রিশনাল ফুড নিয়ে কাজ শুরু করেন, সেটি নিয়ে তিনি জানান, বেশিরভাগ মানুষ ট্রেন্ড দেখে ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু তিনি একটি সমস্যা দেখেছিলেন, মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন হচ্ছে, কিন্তু বাজারে ভেজালমুক্ত পণ্য কম। এখানেই তিনি সুযোগ খুঁজে পান। শুরু হয় এই চিন্তা থেকে মানুষের সমস্যার সমাধান করা। প্রায় ২ বছর আগে ছোট পরিসরে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন বাংলাদেশে একটি সুপরিচিত ও স্বনামধন্য গ্রোথিং ব্র্যান্ড। তার প্রতিষ্ঠানের পিনাট বাটার, মিল্ক বাটার, চকলেট বাটার, ন্যাচারাল বেলের শরবত, অর্গানিক চাসহ প্রায় ৩৫টি পণ্য গ্রাহকদের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা

এই পথে তার অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা ছিল। অনেকেই বলেছিল, ন্যাচারাল প্রোডাক্ট বাংলাদেশে চলবে না। আবার সীমিত পুঁজি, সাপ্লাই চেইন সমস্যা সবই ছিল বাস্তব চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তিনি একটি জিনিসে ফোকাস করেছেন, ভ্যালু ক্রিয়েশন। অর্গানিক কৃষি, ডেইরি, ফুড প্রসেসিং, সবকিছু মিলিয়ে একটি ইন্টিগ্রেটেড ইকোসিস্টেম তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

উদ্যোক্তাদের জন্য বার্তা

তিনি মনে করেন, বেশির ভাগ ব্যবসা প্রফিটের জন্য চলে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে সেই ব্যবসা, যেটি সমাজে ভ্যালু তৈরি করে। এই যাত্রা শুরু হয়েছিল অল্প পুঁজি দিয়ে। কিন্তু তিনি শিখেছেন, টাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স আরও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, যদি কেউ উদ্যোক্তা হতে চায়, তাহলে তাকে এখনই শিখতে হবে, সেলস ও মার্কেটিং, কমিউনিকেশন, ফাইন্যান্সের বেসিক এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। কারণ, ব্যবসা মানে সমস্যার সমাধান করা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা অনেক শিক্ষার্থী ঝুঁকি নিতে চায় না। তারা সিকিউরিটি খোঁজে, স্বাধীনতা নয়, চাকরিকে একমাত্র বড় হওয়ার মাধ্যম দেখেন। ইলিয়াছ মনে করেন চাকরি নিরাপত্তা দিতে পারে, আর ব্যবসা দেয় স্বাধীনতা।