পরিবেশবান্ধব ট্যানারি না থাকায় রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প। ২০১৬ সালে পুরান ঢাকা থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সরকার আশ্বাস দিলেও গত ১০ বছরেও সাভারের ট্যানারিপল্লিতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) গড়ে ওঠেনি। এতে একে একে বিদেশি কমপ্ল্যায়ান্ট বায়ার হাত ছাড়া হয়ে গেছে। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে চামড়ার রপ্তানির বাজার কমে যাওয়ায় বছরে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে দেশ।
রপ্তানি কমলেও চামড়া আমদানি বেড়েছে
অন্যদিকে রপ্তানি কমে গেলেও দেশের বিভিন্ন কারখানায় রপ্তানির জন্য চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে বছরে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের চামড়া আমদানি হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে দেশের চামড়া শিল্পের রপ্তানির বাজারে ধস নামে। রপ্তানি বাড়াতে পরিবেশবান্ধব ট্যানারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কার্যকর পদক্ষেপ এখনো উপেক্ষিত। রপ্তানি ছাড়াও প্রতি বছর কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
চীন প্রধান বাজার, ইউরোপ বন্ধ
বর্তমানে বাংলাদেশি চামড়ার প্রধান রপ্তানির বাজার চীন। সেখানে নন-কমপ্ল্যায়ান্ট বায়ারদের কাছে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে। রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সাল থেকে ইউরোপের বাজারে চামড়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। ইউরোপের বাজারে চামড়া রপ্তানি করতে হলে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অর্গানাইজেশনের সনদ ও লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডাব্লিউজি) পরিবেশ স্বীকৃতি সনদ থাকতে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে চার-পাঁচটি ট্যানারির এলডাব্লিউজি সনদ রয়েছে বলে জানা যায়।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি টিপু সুলতান ইত্তেফাককে বলেন, ‘সরকারের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ট্যানারি মালিকরা অনেক টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু গত ৯ বছরেও সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণ করা হয়নি। এতে রপ্তানির বাজারে ধস নামে। বর্তমানে রপ্তানির বাজার ১২০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। কমপ্ল্যায়ান্ট বায়াররা চামড়া কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। যদি ইটিপি নির্মাণ করা যায় তাহলে রপ্তানির বাজার ৪০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা যাবে। আমরা এ ব্যাপারে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি।’
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বে বর্তমানে চামড়াজাত পণ্যের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। কৃত্রিম চামড়া থেকে উত্পাদিত পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে। দেশের চামড়ার রপ্তানিজাত পণ্য তৈরির অনেক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়। এসব কারখানার জন্য বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করা হচ্ছে। বছরে প্রায় ১২-১৩ কোটি ডলারের চামড়া আমদানি হচ্ছে।
ট্যানারি মালিক তরিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘বিশ্বে চামড়ার ব্যবহার কমে গেছে। সাভারে পরিবেশবান্ধব ট্যানারি করা যায়নি। এতে আমাদের বায়ার কমে গেছে। ইউরোপের বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের ১৫৫টি ট্যানারি রয়েছে। তার মধ্যে চার-পাঁচটি ট্যানারি এলডাব্লিউজি সনদ পেয়েছে। কমপ্ল্যায়ান্ট বায়ারদের কাছে মাত্র ২০ শতাংশ চামড়া রপ্তানি হয়ে থাকে। ট্যানারিগুলো পরিবেশবান্ধব করা না গেলে রপ্তানির বাজার রক্ষা করা যাবে না।’
চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ সংকট
এদিকে চট্টগ্রামে পশুর কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর কোরবানির সময় কোটি কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। চট্টগ্রামে প্রতি বছর ৬-৭ লাখ পশু কোরবানি হয়ে থাকে। একসময় চট্টগ্রামে ২০-২১টি ট্যানারি চালু থাকলেও বর্তমানে একটি মাত্র ট্যানারি চালু রয়েছে। তাদের সক্ষমতা খুবই সীমিত। পরে আড়তদার ব্যবসায়ীরা ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে সংরক্ষণ করা চামড়া বিক্রি করে থাকেন।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি বছর কোরবানির আগে কাঁচা চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু এই দামে আমরা ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করতে পারি না। আরও কম দামে বিক্রি করতে হয়। সরকারের প্রতি আমাদের দাবি, সারা বছর যে দরে কাঁচা চামড়া বিক্রি হয় তার আলোকে যেন কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে। কোরবানির চামড়া আমরা নগদে কিনলেও ট্যানারির কাছে বাকিতে বিক্রি করতে হয়। ট্যানারি মালিকরা ব্যাংক ঋণ সুবিধা পেলেও আড়তদার ব্যবসায়ীরা পান না।



