প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত তাঁর কাজের ধারা, প্রান্তিক মানুষের গল্প বলার পদ্ধতি এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বর্তমান ধারা সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
ডার্ক ওয়ার্ল্ডে হালকা মেজাজের কাজ
শঙ্খ দাশগুপ্ত বলেন, 'বলি', 'গুটি' থেকে 'প্রিয় মালতী'—আগের কাজগুলো বেশি ডার্ক, সিরিয়াস ছিল। কিন্তু 'চা গরম' তুলনামূলক হালকা মেজাজের। এই বদল ইচ্ছাকৃত। তিনি বলেন, “পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা বিবেচনা করলে এই মুহূর্তে আমরা একটা ডার্কার ওয়ার্ল্ডের মধ্যেই আছি। সেটা আমাদের সমাজ, জাতীয়-আন্তর্জাতিক রাজনীতি সব মিলিয়েই। বিনোদন দুনিয়াতেও ডার্ক বা থ্রিলার কনটেন্টই বেশি হচ্ছে। সচেতনভাবে এটাকে পাশ কাটাতে চেয়েছি। চেয়েছি রিফ্রেশিং কিছু করতে, যা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে হবে, আবার বিনোদনও থাকবে।”
প্রান্তিক মানুষের গল্প বলার কৌশল
শঙ্খ দাশগুপ্ত মনে করেন, তিনি নিজেই প্রান্তিক মানুষ। তাঁর বেড়ে ওঠা মফস্বল শহরে, পরে গ্রামে। তিনি বলেন, “ক্লাস ফাইভ থেকে এসএসসি পর্যন্ত বরিশালে ছিলাম। এ সময়টাতে অনেক কিছু শিখেছি। খুব কাছ থেকে মানুষ, তাদের জীবনযাপন দেখেছি। নির্মাতা হিসেবে আমার মনে হয়, অনেক গল্প থাকে যেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি না। সচেতনভাবেই সেসব গল্প বলতে চাই। গল্প শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গল্প তো সারা বাংলাদেশে ছড়ানো আছে, পৃথিবীতে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে। সে গল্পগুলোও ইন্টারেস্টিং হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, গল্প যেন 'লেকচার' না হয়ে ওঠে, সেটা সামাল দেওয়াই তাঁর চ্যালেঞ্জ।
ওটিটির ট্রেন্ড না ধরা
শঙ্খ দাশগুপ্ত বলেন, “আমি সময়ের ট্রেন্ডকে অনুসরণ করতে চাই না। চাই যে বিষয় নিয়ে কাজ করছি, সেটা যেন ১০ বছর পরেও মানুষ রিলেট করতে পারে। একটা ‘চা গরম’, একটা ‘প্রিয় মালতী’ বা ‘গুটি’ ১৫ বছর পরেও সমসাময়িক লাগবে যদি ওই সময়টাকে, ওই সময়ের রাজনীতি ধরতে পারেন। এখন যে প্রবণতা চলছে (ছোট ছোট সিকোয়েন্স), সেটা কত দিন থাকবে জানি না। আমার লক্ষ্য ছোট-বড় যে কাজই করি না কেন, সেটা যেন সময়ের সঙ্গে থাকে, আলোচনা-বিতর্ক উসকে দেয়।”
শিল্পীদের চ্যালেঞ্জ
শঙ্খ দাশগুপ্ত তাঁর কাজে প্রধান শিল্পীকে বারবার 'অস্বস্তি'তে ফেলেন। মেহজাবীন চৌধুরী রোমান্টিক অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু 'প্রিয় মালতী'তে একেবারেই অন্য রকম চরিত্র করেছেন। 'চা গরম'-এ সাফা কবিরের ক্ষেত্রেও সেটা অনেকটা সত্য। তিনি বলেন, “চ্যালেঞ্জটা আপনি শিল্পীকে যে মুহূর্তে দেবেন, তিনিও কিন্তু একটা নতুন অ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে পড়ে যাবেন। সেটা মেহজাবীনের জায়গা থেকে হোক বা ‘বলি’র চঞ্চল (চৌধুরী) ভাই, ‘গুটি’র (আজমেরী হক) বাঁধন সবার ক্ষেত্রেই। শিল্পী হিসেবে সবাই খুব দক্ষ; কিন্তু আমরা অনেক সময়ই একটা লুপের মধ্যে পড়ে যাই।”
'চা গরম' কেন দর্শক পছন্দ করল
শঙ্খ দাশগুপ্তের মতে, ‘চা গরম’ তাজা হাওয়ার মতো। ওটিটি বা সিনেমায় বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে, তা থেকে ভিন্ন। তিনি বলেন, “আমরা সচেতনভাবে এমন একটা দুনিয়ার গল্প বলার চেষ্টা করেছি, যেখানে নানা সংকট আছে কিন্তু মানুষ হাসতে ভুলে যায়নি। চা–বাগানের ওই মানুষগুলো এত কষ্টের মধ্যেও হেসে হেসে কথা বলে। সেটা রবিন, আইরিন, নন্দিনী—যে চরিত্রই হোক সবাই কিন্তু ভালো মানুষ হিসেবে হাজির হয়। এই চরিত্রগুলো মানুষ পছন্দ করেছে। আরেকটা ব্যাপার, রবিন বা নন্দিনী, সব চরিত্রকে মানুষের বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। তাদের অভিনয়, কমিক টাইমিং দর্শকের ভালো লেগেছে।” তিনি ভারতের টিভিএফের 'পঞ্চায়েত' থেকে প্রেরণা নেওয়ার কথাও জানান।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
‘প্রিয় মালতী’ মুক্তি পেয়েছিল সিনেমা হলে, দুই বছর পর ‘চা গরম’ এল ওটিটিতে। এখন শঙ্খ দাশগুপ্ত প্রেক্ষাগৃহের জন্যই নতুন সিনেমার কাজ করছেন। তিনি জানান, “চিত্রনাট্য শেষ হলে চলতি বছরেই শুটিং শুরু করব। আগামী বছর ঈদে বা ঈদ ছাড়া অন্য সময়ে সিনেমাটি মুক্তি পেতে পারে। আগে তো কাজটা শেষ করি!”



