ডেথ ভ্যালির রহস্যময় হাঁটা পাথরের আসল কারণ জানা গেল
ডেথ ভ্যালির হাঁটা পাথরের রহস্য সমাধান

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক পৃথিবীর সবচেয়ে রুক্ষ, শুষ্ক ও উত্তপ্ত স্থানগুলোর একটি। বাংলায় একে মৃত্যু উপত্যকাও বলা হয়। এই অঞ্চল নানা অদ্ভুত প্রাকৃতিক ঘটনার জন্য বিখ্যাত। যেমন কখনো কখনো কয়েক দশক পরপর পুরো মরুভূমি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে, যাকে বলা হয় সুপারব্লুম। আবার কখনো সৃষ্টি হয় ক্ষণস্থায়ী হ্রদ। কিন্তু ডেথ ভ্যালির সবচেয়ে বড় রহস্য হলো এর মাটির বুকে থাকা কিছু পাথর, যা নাকি নিজে নিজেই চলাফেরা করে।

রেসট্র্যাক প্লেয়ার রহস্যময় পাথর

ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের এক দুর্গম প্রান্তে রয়েছে রেসট্র্যাক প্লেয়া নামের একটি শুকিয়ে যাওয়া বিশাল হ্রদ। এর বুক ফেটে চৌচির। এই শুষ্ক প্রান্তরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শত শত পাথর, যাদের বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সেইলিং স্টোন বা ভাসমান পাথর। মজার ব্যাপার হলো, এই পাথরগুলোর কোনো কোনোটির ওজন প্রায় ৩২০ কিলোগ্রাম, অর্থাৎ প্রায় চারজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওজনের সমান। এত ভারী পাথরগুলো এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে নেই; এগুলো নিজে নিজে প্রায় ৪৫৭ মিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দেয়। যাওয়ার সময় শুকিয়ে যাওয়া কাদার ওপর রেখে যায় তাদের চলাচলের স্পষ্ট ও দীর্ঘ দাগ। কিন্তু মরুভূমির এই জনমানবহীন প্রান্তরে এত ভারী পাথরগুলোকে ধাক্কা দিয়ে কে চালিয়ে নেয়?

দশকের পর দশকের রহস্য

দশকের পর দশক ধরে এই রহস্যের কোনো কূলকিনারা করতে পারছিলেন না বিজ্ঞানীরা। কেউ বলতেন প্রবল ঝোড়ো বাতাসের কারণে পাথরগুলো ঘষটে ঘষটে এগিয়ে যায়। কেউ আবার বলতেন, বৃষ্টির পর মাটির ওপর শেওলার পিচ্ছিল আস্তরণ তৈরি হয়, যার ওপর দিয়ে পাথরগুলো অনায়াসে পিছলে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, কেউই কখনো এই পাথরগুলোকে নিজের চোখে নড়াচড়া করতে দেখেননি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণার উদ্যোগ

রহস্যের এই তালা ভাঙতে ২০১৩ সালের দিকে মাঠে নামে প্রত্নজীববিদ রিচার্ড নরিস ও তাঁর দল। এই দলের এক সদস্য রালফ লরেঞ্জ শুরুতে ভেবেছিলেন, এটি হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিরক্তিকর একটি পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। কারণ, বছরের পর বছর এই মরুভূমিতে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের অনুমতি নিয়ে রিচার্ড নরিস ও তাঁর দল ১৫টি পাথরের গায়ে মোশন অ্যাকটিভেটেড জিপিএস ট্র্যাকার লাগিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে ওই এলাকায় বসানো হয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আবহাওয়া কেন্দ্র। বিজ্ঞানীরা কিন্তু খুব বেশি আশা নিয়ে ওখানে যাননি, কারণ তাঁদের আগে অনেকেই এই রহস্য সমাধানের চেষ্টা করে খালি হাতে ফিরেছেন। রিচার্ড নরিস ভেবেছিলেন, অন্তত ৫ থেকে ১০ বছর হয়তো তাঁদের এই যন্ত্রপাতির দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হবে।

সৌভাগ্যের দেখা

বিজ্ঞানে মাঝেমধ্যে দারুণ কিছু সৌভাগ্যের দেখা মেলে। নরিস ও তাঁর দলের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হলো। টানা ১০ বছর অপেক্ষা করতে হলো না, মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রিচার্ড নরিস ও তাঁর মামাতো ভাই জিম নরিস ডেথ ভ্যালিতে গিয়ে সেই জাদুকরি ঘটনাটি নিজেদের চোখে ঘটতে দেখলেন! তাঁরা দেখলেন, শীতের মাসগুলোয় ওই শুকনা হ্রদটিতে বৃষ্টির কারণে খুব অল্প গভীরতার পানি জমে যায়। রাতে মরুভূমির তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়, তখন সেই পানি জমে মাটির ওপর বরফের এক পাতলা আস্তরণ তৈরি করে। এরপর সকালে যখন সূর্য ওঠে এবং রোদ পড়ে চারপাশ একটু একটু গরম হতে শুরু করে, তখন সেই বরফের আস্তরণ ভাঙতে শুরু করে। বরফের এই ভাঙা বড় বড় টুকরাগুলো তখন ভাসতে থাকে এবং মরুভূমির হালকা বাতাস সেই বরফের চাদরগুলোকে সামনের দিকে ঠেলতে থাকে। বরফের এই বিশাল শিটগুলো যখন হাওয়ায় ভেসে সামনের দিকে এগোয়, তখন সেগুলো পথের মধ্যে থাকা ভারী পাথরগুলোকেও প্রচণ্ড শক্তিতে ধাক্কা দেয়। বরফের ধাক্কায় পাথরগুলো কাদামাটির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় এবং পেছনে রেখে যায় সেই বিখ্যাত দাগ।

কেন আগে কেউ দেখেনি?

প্রশ্ন হলো, তাহলে এত দিন কেউ এটা দেখতে পায়নি কেন? জিম নরিস জানান, পাথরগুলোর এই নড়াচড়া খুবই ধীরে হয়। যখন বরফের পুরো চাদরটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরে যায়, তখন এর সঙ্গে আটকে থাকা সব কটি পাথর একসঙ্গে নড়তে থাকে। তুমি যদি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকো, তোমার মনে হবে কিছুই নড়ছে না! চারপাশের সবকিছু একসঙ্গে নড়লে মানুষের চোখ সহজে সেই নড়াচড়া ধরতে পারে না। তাই হয়তো অনেক পর্যটক এ ঘটনা নিজের চোখে দেখেও বুঝতে পারেননি যে পাথরগুলো আসলে নড়ছে। বিষয়টা ফেরির উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়: ফেরিতে উঠে গাড়ির মধ্যে বসে থাকলে তুমি বুঝতে পারবে না কখন ফেরি চলতে শুরু করেছে, কারণ ফেরি যে চলছে তা বুঝতে হলে তোমাকে পানির দিকে তাকাতে হবে।

গবেষণাপত্র প্রকাশ

২০১৪ সালে এই গবেষক দল তাদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ওপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। এর মাধ্যমেই ডেথ ভ্যালির হাঁটা পাথরের রহস্য আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধান হয়। তবে একটি ছোট প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। রিচার্ড নরিস জানিয়েছেন, তাঁরা আড়াই মাসে শত শত পাথরকে নড়তে দেখেছেন, কিন্তু সবচেয়ে ভারী (৩২০ কেজি ওজনের) পাথরগুলোকে তাঁরা সেই সময়ে নড়তে দেখেননি। এত ভারী পাথরগুলোও কি ঠিক একই বরফের ধাক্কায় নড়ে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো বড় শক্তি কাজ করে? এই প্রশ্নের শতভাগ নিশ্চিত উত্তর এখনো মেলেনি। কিন্তু রিচার্ড নরিসদের ওই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে এখনো বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।