হাফেজ থেকে লটকনচাষি: রোকন উদ্দিনের সফলতার গল্প
হাফেজ থেকে লটকনচাষি: রোকন উদ্দিনের সফলতা

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নয়নপুর গ্রামে রোকন উদ্দিনের বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে লটকন। হলুদাভ পাকা ফলের ভারে নুয়ে থাকা সারি সারি লটকনগাছ। কখনো পাইকারদের সঙ্গে দরদাম করছেন, কখনো দূরদূরান্ত থেকে আসা কৃষকদের উন্নত জাতের কলম দেখাচ্ছেন রোকন উদ্দিন।

ইমাম থেকে কৃষক: পথচলার শুরু

কয়েক বছর আগেও হাফেজ রোকন উদ্দিনের পরিচয় ছিল মসজিদের ইমাম হিসেবে। জীবিকার জন্য দীর্ঘদিন বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় ইমামতি করেছেন। কিন্তু ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকেই গাছ লাগানো ছিল তাঁর নেশা। মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা বাড়ির আঙিনায় সুযোগ পেলেই ফলগাছ রোপণ করতেন। একসময় সেই শখই তাঁকে বাণিজ্যিক ফল চাষে নিয়ে আসে।

রোকন উদ্দিন জানান, ২০১৮ সালে মুক্তাগাছা উপজেলা থেকে ৩০টি লটকনের চারা কিনে যাত্রা শুরু করেন তিনি। তবে শুরুতেই বড় ধাক্কা খেতে হয়। অনেক গাছ পুরুষ হওয়ায় প্রত্যাশিত ফলন পাননি। এরপর নিজেই কলম করার কৌশল শিখে ভালো ফলনশীল গাছ নির্বাচন করে নতুন করে বাগান গড়ে তোলেন। পুরোনো এক বিঘা জমির পাশাপাশি নতুন করে তিন বিঘা জমিতে প্রায় ২০০টি গাছ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন। ২০২৩ সাল থেকে বাগানে সফলতা আসতে শুরু করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘নয়নপুরী লটকন’ নামকরণের গল্প

রোকন উদ্দিন বলেন, আট বছরে ৮–১০টি জাত নিয়ে কাজ করেছেন। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুটি জাতকে সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতের ফল বড়, খেতে খুব মিষ্টি এবং বাজারেও এর চাহিদা বেশি। কৃষিভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’–এর উপস্থাপক শাইখ সিরাজ চলতি বছর তাঁর বাগান পরিদর্শনে এসে গ্রামের নাম অনুসারে জাতটির নাম ‘নয়নপুরী লটকন’ রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে এ নামেই পরিচিতি পেয়েছে জাতটি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাণিজ্যিক সাফল্য ও চারা বিক্রি

বর্তমানে রোকন উদ্দিনের বাগানের লটকন প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। সামনে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন। নিজের বাগানের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাগানের ফলও পাইকারিভাবে কিনে বাজারজাত করেন তিনি।

রোকন উদ্দিন জানান, বর্তমানে চার বিঘা জমির দুটি বাগানে লটকনের চাষ করছেন তিনি। নিজে চাষের পাশাপাশি কলম করে চারা উৎপাদন করে বিক্রিও করছেন। এক বছরের কলম চারা ১০০ টাকা এবং দেড় থেকে দুই বছরের কলম চারা ২০০–২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। বছরে তার এখানে ৫-৮ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা তাঁর বাগানে এসে চারা সংগ্রহ করেন। ভালো জাতের চারা না হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই পরীক্ষিত গাছ থেকেই চারা তৈরি করেন। চারা নিয়ে যেন অন্যরাও সফল হন, সেটাই চান।

কৃষকদের আস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

চারা কিনতে আসা গফরগাঁও উপজেলার কৃষক মো. এনামুল হকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর বাগান দেখে এসেছিলাম। ফল খেয়ে খুব ভালো লেগেছে। তাই ৩২টি কলম চারা কিনেছি। সফল হলে আমিও বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান করব।’

স্থানীয় কৃষক আবদুস সালাম জানান, রোকন উদ্দিনের লটকনের ফল বড়, দেখতে সুন্দর ও খেতে মিষ্টি হয়। এ কারণে তাঁর চারার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে। তাই এখানে অনেকে আসেন চারা নিতে ও ফল কিনতে।

ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, ‘শখ থেকে শুরু হওয়া রোকন উদ্দিনের পথচলা এখন আর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও উদ্ভাবনী চিন্তা থাকলে গ্রামবাংলার পতিত জমিও একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।’

উপজেলার প্রায় ৫ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হচ্ছে উল্লেখ করে কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান আরও বলেন, ‘রোকন উদ্দিনের মতো উদ্যোক্তারা উন্নত মানের চারা উৎপাদন করায় নতুন নতুন বাগান গড়ে উঠছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভালুকার লটকন রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে।’