গ্যাস সংকটে সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ, কৃষি খাতে উদ্বেগ
গ্যাস সরবরাহের তীব্র সংকটের মুখে রাষ্ট্রায়ত্ত দুইটি প্রধান সার কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) বুধবার (৪ মার্চ) বিকাল ৩টা থেকে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। তবে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে ইউরিয়া উৎপাদন এখনও চলমান রয়েছে, কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে সেটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিইউএফএলের উৎপাদন ক্ষমতা ও আর্থিক প্রভাব
সিইউএফএল সূত্র থেকে জানা গেছে, কারখানাটি পূর্ণমাত্রায় চালু থাকলে দৈনিক প্রায় ১১ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করতে সক্ষম। প্রতি টন সার ৩৮ হাজার টাকা হিসাবে কারখানাটিতে দৈনিক চার কোটি ১৮ লাখ টাকার সার উৎপাদিত হয়। সম্পূর্ণ গ্যাসনির্ভর এই কারখানায় পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের জন্য দৈনিক ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়।
গ্যাস সংকট এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক সমস্যার কারণে গত অর্থবছরে কারখানাটিতে প্রায় আড়াই লাখ টন ইউরিয়া সার উৎপাদিত হয়েছে, যা তাদের স্বাভাবিক ক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
বাংলাদেশের সার চাহিদা ও উৎপাদন পরিস্থিতি
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। এর মধ্যে সিইউএফএলসহ বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন কারখানাগুলো প্রায় ১০ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন করে থাকে। অবশিষ্ট ১৬ লাখ টন ইউরিয়া বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
যান্ত্রিক সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ধের প্রভাব
সিইউএফএলের কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, গ্যাসনির্ভর এই কারখানা টানা বন্ধ থাকলে বিভিন্ন যান্ত্রিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। কেমিক্যালের বিভিন্ন সঞ্চালন লাইনসহ যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, ফলে কারখানা চালু করার পরেও যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সিইউএফএল সূত্রে জানা যায়, গত দুই বছর ধরে কারখানাটি বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। কখনও যান্ত্রিক ত্রুটি, আবার কখনও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে কারখানাটি বন্ধ ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র পাঁচ দিন কারখানা চালু ছিল। এর বাইরে ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে।
সম্প্রতিক সময়ের উৎপাদন বন্ধের ইতিহাস
টানা ১০ মাস বন্ধের পর ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর সিইউএফএল চালু হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি আবারও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে দীর্ঘ সময় লাগে কারখানাটি চালু করতে। সর্বশেষ ওই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটার সময় কারখানা চালু হয়। টানা দেড় মাস চালু থাকার পর গত ১১ এপ্রিল থেকে গ্যাস বন্ধ করে দেওয়ায় কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর টানা ছয় মাস ইউরিয়া বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর সেটি ফের চালু হয়। কিন্তু, চালুর দিনই আবার বন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর গত ২ মার্চ আবার চালু হলেও গ্যাস সংকটের কারণে বুধবার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে সিইউএফএলের উৎপাদন বিভাগীয় প্রধান উত্তম চৌধুরী বলেন, “বুধবার বিকালে কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। গ্যাস সরবরাহ পেলে আবার উৎপাদন শুরু করা যাবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা কারখানার নিয়মিত উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে এবং কৃষি খাতে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, বিশেষ করে যখন দেশে সার উৎপাদন ও সরবরাহের উপর কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে সার উৎপাদন বন্ধ থাকতে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
