আলু চাষিদের মাথায় হাত, উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বিক্রি হচ্ছে আলু
দ্বিতীয় বছর ধরে আলু চাষিরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পাইকারি বাজারে আলুর দাম উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষকরা পরবর্তী মৌসুমে আলু চাষ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। রাজশাহীর পবা উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের কৃষক মিথু হাজি গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবার চাষের জমি বাড়িয়েছিলেন। তিনি ১২ বিঘা ৮ কাঠা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। কিন্তু ২৬ ফেব্রুয়ারি নওহাটা পাইকারি বাজারে তার উৎপাদন নিয়ে যাওয়ার পর ব্যবসায়ীরা মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকা কেজি দর দিয়েছেন।
প্রতি বিঘায় ৬৫ হাজার টাকা খরচ, প্রতি কেজিতে ৯ টাকা ক্ষতি
মিথু হাজির বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে তার প্রায় ৬৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই খরচের মধ্যে রয়েছে ১৭ হাজার টাকা জমি লিজ, ১২ হাজার টাকা বীজ, ৩ হাজার টাকা জমি প্রস্তুত, ১২ হাজার টাকা সার ও কীটনাশক, ১৩ হাজার টাকা শ্রমিক মজুরি, ৪ হাজার টাকা সেচ ও সংগ্রহ এবং ৪ হাজার টাকা অন্যান্য খরচ। গড়ে প্রতি বিঘা থেকে তিনি ৫৫ বস্তা আলু পেয়েছেন, যার প্রতিটি বস্তার ওজন ৬৫ কেজি। অর্থাৎ প্রতি বিঘা থেকে মোট ৩,৫৭৫ কেজি আলু উৎপাদিত হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৮ টাকা। ৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করায় তার প্রতি কেজিতে সরাসরি ৯ টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
শহুরে বাজারে দাম স্থিতিশীল, পাইকারি বাজারে ধস
কৃষকরা জানান, শহুরে খুচরা বাজারে আলুর দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও পাইকারি ব্যবসায়ীরা আমদানি বৃদ্ধি ও সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমিয়ে দিয়েছেন। অনেক চাষি পাইকারি বাজারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজশাহীর পবা, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন বাজারে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চাষিরা জানাচ্ছেন, তাদের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ১৬ থেকে ১৮ টাকার মধ্যে থাকলেও পাইকারি দাম ৮ থেকে ৯ টাকায় স্থির রয়েছে।
নওগাঁয় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
নওগাঁ জেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সেখানে পাইকারি বাজারে আলু ৫ থেকে ৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় চাষিরা বলছেন, বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশকের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার তাদের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ১২ থেকে ১৫ টাকা হয়েছে। বর্তমান দামে অনেক চাষি সংগ্রহ ও পরিবহন খরচও তুলতে পারছেন না। কোল্ড স্টোরেজও এখন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাষিরা দাবি করছেন, স্টোরেজ ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে ভালো দাম পাওয়ার আশায় আলু সংরক্ষণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
চাষ কমলেও উৎপাদন বেড়েছে, দাম পড়েছে
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার ২১,৯৭০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্য ছিল ৪,৭৪,৩৩০ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে ২৫,৯৪০ হেক্টর জমিতে চাষ করে ৫,১৪,৩৬০ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। যদিও এবার চাষের জমি ৩,৯৭০ হেক্টর কমেছে, তবুও ভালো ফলন ও সরবরাহ বৃদ্ধি দাম পড়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক হুমায়রা মন্ডল জানান, গত বছরের ক্ষতির পর চাষিদের চাষ কমাতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক চাষি আলু চাষ চালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, "এবার উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম নেমে গেছে।"
অন্যান্য ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন চাষিরা
ক্ষতি বেড়ে যাওয়া এবং খরচ বৃদ্ধির কারণে অনেক চাষি এখন বলছেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী বছর তারা অন্যান্য ফসল চাষের দিকে ঝুঁকবেন। মিথু হাজির মতো কৃষকরা যারা গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় চাষ বাড়িয়েছিলেন, তারাও এখন হতাশায় ভুগছেন। পাইকারি বাজারে দাম না পাওয়ায় তারা ঋণের বোঝা নিয়ে আরও সংকটে পড়েছেন। কৃষি অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের আলু উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
