আলুচাষে চরম লোকসান: উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম অর্ধেক, কৃষকের দুর্ভোগ
আলুচাষে লোকসান: দাম কম, কৃষকের দুর্ভোগ

আলুচাষে চরম লোকসান: উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম অর্ধেকে নেমেছে

এক কাপ চায়ের দাম দশ টাকা। অথচ এক কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকা কেজি দরে। একজন পুরুষ কৃষিশ্রমিকের মজুরি দিতে হয় ৫৫০ টাকা। এক মণ আলু বিক্রি করেও শ্রমিকের মজুরির টাকা উঠছে না। কৃষকদের প্রায় সব ধরনের ফসল আবাদে লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেক কৃষক সরকারি প্রণোদনাও পান না। চলতি মৌসুমে আবারও লোকসানের মুখে পড়েছেন আলুচাষিরা।

বাজারে আলুর দামের বেহাল দশা

নতুন আলু পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে প্রকার ভেদে প্রতি কেজি ছয় থেকে সাত টাকায়। আর খুচরাতে বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৮ থেকে ৯ টাকা। এর সঙ্গে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত পাঁচ কেজি করে ‘ঢলন’ দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। ফলে ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে চরম লোকসান গুনছেন চাষিরা।

কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির চিত্র

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের পাঠকপাড়া গ্রামের আলুচাষি প্রদীপ রায় বলেন, “দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করে তুলনামূলক ভালো ফলন পেয়েছেন। দুই বিঘায় ৮০ থেকে ৮৫ বস্তা (প্রতি বস্তা ৬০ কেজি) আলু উৎপাদন হয়েছে। আলুর ধরন অনুযায়ী প্রতি বস্তা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে প্রতি বিঘায় ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা পাওয়া গেলেও উৎপাদন খরচ হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। ফলে বিঘাপ্রতি লোকসান হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা।”

সমশেরনগর এলাকার আলু চাষি সাইদুর রহমান বলেন, “তিনি আড়াই বিঘা জমিতে আলু রোপণ করেছেন। জমি থেকে আলু উত্তোলন করতে অনেক খরচ হচ্ছে। সাত টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করেছেন। এতে তার উৎপাদন খরচও উঠছে না।”

বুজরুক সমশেরনগর এলাকার আলু চাষি জয়নাল আবেদীন বলেন, “আড়াই বিঘা জমিতে আলু চাষ করে বিঘাপ্রতি প্রায় ৪৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু উৎপাদিত আলু বিক্রি করে পাওয়া গেছে মাত্র ২৪ হাজার টাকা। এতে ২৭ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। আবাদ করতে গিয়ে এভাবে লোকসান হলে কৃষকদের পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।”

ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য

আলু ব্যবসায়ী জয়ন্ত সাহা বলেন, “গত বছরের মতো এবারও আলু চাষে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই ধার-দেনা ঋণ করে জমির পরিমাণ কমিয়ে আবার আলু চাষ করেছেন। কিন্তু এবারও লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ীও আলু আবাদে অর্থ জোগান দিয়ে লোকসানে পড়েছেন।”

কৃষকরা বলছেন, “এখন আলু তোলা শেষ পর্যায়ে। ৮-১০ দিন আগে ফুলবাড়ীতে জমির আলু উঠতে শুরু করেছিল, তখনও বাজার দর ছিল ১২ থেকে ১৫ টাকা কেজি, যা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, “এ বছর উপজেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমি এবং আবাদও হয়েছে সমপরিমাণ জমিতে। যার উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫,৫২০ মেট্রিক টন। তবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কৃষকদের চাষাবাদ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কাজ করে থাকে। বাজার দর নির্ধারণের বিষয়টি কৃষি বিপণন বিভাগ দেখভাল করে থাকে।”

সরকারি প্রণোদনার অভাব

অনেক কৃষক সরকারি প্রণোদনা না পাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এই অবস্থায় কৃষি বিপণন বিভাগের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আলুচাষে লোকসান কমাতে দাম স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষকদের সহায়তা প্রদান জরুরি হয়ে উঠেছে।