দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে খাল পুনরুদ্ধারে সাফল: কৃষকদের হাতে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে খাল পুনরুদ্ধারে সাফল প্রকল্পের সাফল্য

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে খাল পুনরুদ্ধারে সাফল: কৃষকদের হাতে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশ সরকার যখন দেশজুড়ে বিশ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তখন দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে এর প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত প্রকট। এই অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সলিডারিদাদ নেটওয়ার্ক এশিয়া বাস্তবায়িত ‘সফল ফর ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (SAFAL for IWRM)’ প্রকল্পটি জাতীয় সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কৌশলের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দ্বিমুখী পানিসংকট ও খালের মৃত্যু

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল, যা দেশের মোট ভূখণ্ডের ২৭ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত, বর্তমানে ‘দ্বিমুখী পানিসংকটে’র মুখোমুখি। একদিকে পলি জমে খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির চরম অভাব তৈরি হয়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই খালগুলোই ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীবনরেখা, কিন্তু পলি জমা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এগুলো আজ নিশ্চল নর্দমায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, পাশাপাশি বোরো মৌসুমে সেচের মিঠাপানির অভাব এবং মাটি ও পানির লবণাক্ততা প্রকট হচ্ছে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে জলবায়ু–সহনশীলতার চাবিকাঠি

নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে এবং সলিডারিদাদ নেটওয়ার্ক এশিয়া কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘সফল ফর আইডব্লিউআরএম’ প্রকল্পটি প্রমাণ করেছে যে জলবায়ু–সহনশীলতার চাবিকাঠি কেবল বড় প্রকৌশলগত কাঠামোর মধ্যে নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতেই নিহিত। প্রকল্পটি দেখিয়েছে, খাল পুনরুজ্জীবনে তৃণমূল পর্যায়ের জনসম্পৃক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করলে স্থানীয় জলচক্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যা কৃষি ফলন ১৬ শতাংশ এবং খানা আয় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। এই মডেলটি সরাসরি ‘বাংলাদেশ ডেলটা প্ল্যান (বিডিপি) ২১০০’ এবং সরকারের বিশ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের অগ্রাধিকার লক্ষ্যকে সমর্থন করে।

ক্ষুদ্র জলাধার পুনরুজ্জীবন ও কৃষকদের মালিকানা

আশিটি মাইক্রো-ওয়াটারশেড বা ক্ষুদ্র জলাধার পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে—যার আওতায় রয়েছে প্রায় একশ কিলোমিটার খাল—প্রকল্পটি নব্বই হাজারেরও বেশি কৃষক পরিবারের পানির বাস্তবতাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এর ফলাফল ডেলটার জন্য অলৌকিক ঘটনার চেয়ে কম কিছু নয়: সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা ৪২ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ শতাংশে নেমে এসেছে, আর উপরিভাগের পানির ব্যবহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশে।

প্রথাগত বড় বাঁধ বা সরকারি প্রকল্পের পরিবর্তে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘ক্ষুদ্র জলাধার’ বা মাইক্রো-ওয়াটারশেড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকদের নিজেদের ভাগ্য গড়ার সুযোগ। গ্রামের সাধারণ কৃষকদের নিয়ে গঠিত হয়েছে আশিটি কমিটি, যারা নিজেরাই ঠিক করে কোন খাল কখন খনন করা হবে, কে কতটুকু পানি পাবে এবং খালের বাঁধ কীভাবে রক্ষা করা হবে।

অর্জন ও প্রভাব

এই মডেলের বিশেষত্ব হলো এর পরিধি এবং তাৎক্ষণিক ফলাফল:

  • ফসলের নিবিড়তা: বার্ষিক ফসলের নিবিড়তা ৩৬.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগে যেখানে দুটি ফসল হতো সেখানে এখন তিনটি ফসল ফলানোর সুযোগ করে দিয়েছে।
  • ফলন বৃদ্ধি: সামগ্রিক ফলন ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, বোরো ধানের ফলন ২৭ শতাংশ এবং বাগদা চিংড়ি উৎপাদন ৫৫ শতাংশ বেড়েছে।
  • সেচ খরচ হ্রাস: ভূগর্ভস্থ পানির বদলে খালের মিঠাপানি ব্যবহারের ফলে খরচ কমেছে ২৬ শতাংশ।
  • আয় বৃদ্ধি: ভালো ফলন এবং উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় কৃষক পরিবারগুলোর গড় আয় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • ন্যায়বিচার ও শান্তি: বর্তমানে ৯৮ শতাংশ কৃষক মনে করেন যে পানি বণ্টন ব্যবস্থা অত্যন্ত স্বচ্ছ ও ন্যায্য, যা গ্রামীণ অঞ্চলে পানি নিয়ে চিরাচরিত দ্বন্দ্ব নির্মূল করেছে।
  • নারীর নেতৃত্ব: পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির ৩০ শতাংশ নেতৃত্বে রয়েছেন নারী, যারা বেড়িবাঁধের ওপর সবজি চাষ বা ‘ডাইক ইকোনমি’র মাধ্যমে পারিবারিক আয় বৃদ্ধির নতুন ধারা তৈরি করেছেন।

ডেলটা প্ল্যান ২১০০ ও প্রসারণযোগ্য রূপরেখা

বাংলাদেশ সরকারের ‘ডেলটা প্ল্যান ২১০০’ বা শতবর্ষী বদ্বীপ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন। সাফল ফর ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের এই ‘কমিউনিটি-লেড’ বা জন-অংশগ্রহণমূলক মডেলটি সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি নিখুঁত উদাহরণ। এটি প্রমাণ করেছে যে, যখন স্থানীয় মানুষের হাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন জলবায়ু অভিযোজন আর কেবল একটি শব্দ থাকে না—তা হয়ে ওঠে মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি।

সাফল প্রকল্পের প্রভাব দক্ষিণ-পশ্চিমের পাঁচটি জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে, যা ডেলটা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নের এই সময়ে সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। লবণাক্ততা ও খরাসহনশীল বীজের সঙ্গে জৈব বালাইনাশক, কম্পোস্ট সার, মালচিং এবং ন্যূনতম চাষাবাদের মতো পুনরুৎপাদনশীল কৃষি পদ্ধতির সমন্বয়ে প্রকল্পটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এই অঞ্চলকে একটি উৎপাদনশীল খাদ্যের ভান্ডারে পরিণত করেছে। প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার আটশ আটত্রিশ হেক্টর জমি এখন এই পানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার আওতায় এসেছে।

আগামীর নীতিনির্ধারণী পথ

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় যখন খাল উদ্ধারে ১৮০ দিনের পাইলট কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে, তখন দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের জন্য ‘সফল’ মডেলের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। ডেলটার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তিনটি কৌশলগত অগ্রাধিকার প্রয়োজন:

  1. প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি: ক্ষুদ্র জলাধার কমিটিগুলোকে আইনি স্বীকৃতি প্রদান এবং স্থানীয় সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা, যাতে খালের রক্ষণাবেক্ষণ টেকসই হয়।
  2. সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ: জলবায়ু-সহনশীল বীজের সরবরাহ এবং ন্যায্য বাজার সংযোগ নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
  3. পুনরুৎপাদনশীল মডেলে বিনিয়োগ: খাল পুনঃখননের পাশাপাশি পুনরুৎপাদনশীল কৃষিতে গুরুত্ব দেওয়া, যাতে ফসলের নিবিড়তা বাড়লেও মাটির উর্বরতা নষ্ট না হয়।

সাফল প্রকল্প দেখিয়ে দিয়েছে যে যখন আমরা জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রকৃতির স্বাভাবিক ব্যবস্থাগুলোকে পুনরুদ্ধার করি, তখন সমৃদ্ধি আপনিই ধরা দেয়। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের এই সফলতার গল্প আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয় বরং সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই প্রকৃত সমাধান। এই আশিটি জলাধার আজ বাংলাদেশের অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য এক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।