টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর সোনালি সমারোহ
যমুনা নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এখন সূর্যমুখীর হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে। মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া এই সোনালি ফসলের মাঠ কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে এবং দর্শনার্থীদের জন্য হয়ে উঠেছে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্যের আধার। টাঙ্গাইল সদর উপজেলা সহ ভূঞাপুর, গোপালপুর, নাগরপুর ও কালিহাতী উপজেলার চরাঞ্চলে এই মৌসুমে সূর্যমুখী চাষের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে।
কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা
সরকারি সহায়তা, অনুকূল মাটি ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি এবং উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড তেলবীজ জাত টিএসএফ-২৭৫ এর ব্যবহারের ফলে প্রায় ৪৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। কাকুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ গয়লা চরের মতো দুর্গম এলাকাগুলোতেও এখন সূর্যমুখীর চাষ দেখা যাচ্ছে। কাকুয়া ইউনিয়ন ও নদীতীরবর্তী এলাকার মাঠ পরিদর্শনে দেখা গেছে, সূর্যমুখীর ফুলে ভরা মাঠে মৌমাছির গুঞ্জন ও পাখির কলতান পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
কৃষকদের মুখে সন্তোষ: প্রথমবারের মতো এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করা আবদুল মজিদ বলেন, "আমি আগে ভাবতাম সূর্যমুখী শুধু সৌন্দর্যের ফুল। এখন দেখছি এটি তেলের চাহিদা মেটাতে পারে এবং ভালো আয়ও দিতে পারে।" অন্যদিকে আনোয়ার হোসেন গত বছর অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি লাভের পর এই মৌসুমে সাত বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করছেন।
ঐতিহ্যবাহী ফসলের চেয়ে সুবিধা
কৃষক হাতেম আলি উল্লেখ করেন যে, ধান বা পাটের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে কম পানি ও সার প্রয়োজন হয় এবং এটি পোকামাকড়ের আক্রমণের প্রতিও কম সংবেদনশীল। তিনি বলেন, "সূর্যমুখী তেলের বাজার চাহিদা বেশি, তাই আমি ভবিষ্যতে চাষাবাদ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি।"
কৃষি পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে যমুনা নদীর তীরে ভ্রমণে আসা কানিস ফাতেমা বলেন, "এই মাঠগুলো চোখ ধাঁধানো ও শান্তিপূর্ণ। আমি জানতাম না এই অঞ্চলে এত বড় আকারের সূর্যমুখী চাষ হয়।" সন্ধ্যার আগে মৌমাছিরা যখন মধু সংগ্রহ করে, তখন স্থানীয় ও পর্যটকরা এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় জমায়।
কৃষি বিভাগের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুমানা আখতার বলেন, "সূর্যমুখী একটি লাভজনক বিকল্প তেলবীজ ফসল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা সরিষার ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং স্বাস্থ্যকর ভোজ্যতেলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।" তিনি আরও যোগ করেন যে টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে সূর্যমুখী চাষ ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং কৃষি বিভাগ কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নতমানের বীজ ও সার সরবরাহ করছে।
ভোজ্যতেল উৎপাদনে অবদান রাখার পাশাপাশি সূর্যমুখী চাষাবাদ জেলায় কৃষি পর্যটনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। রুমানা আখতার বলেন, "যদি আধুনিক চাষ পদ্ধতি অব্যাহত থাকে, তাহলে সূর্যমুখী টাঙ্গাইলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর আনতে পারে।"
সূর্যমুখীর এই সোনালি বিপ্লব শুধু কৃষকদের আর্থিক স্বচ্ছলতাই বাড়াচ্ছে না, বরং টাঙ্গাইলকে কৃষি পর্যটনের নতুন গন্তব্য হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করছে। ফসলের এই সম্প্রসারণ স্থানীয় অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।
