গোমতী চরে সূর্যমুখীর হলুদ সাম্রাজ্য: দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখরিত পিকনিক স্পট
কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ড থেকে বুড়িং রোডে মাত্র ১০ টাকা অটোরিকশা ভাড়ায় পালপাড়া গোমতী সেতুর গোড়ায় পৌঁছানো যায়। সেতু থেকে পূর্ব দিকে তাকালেই চোখে পড়ে গোমতী চরের সূর্যমুখীর হলুদ সাম্রাজ্য, যা যেন হাতছানি দিয়ে দর্শনার্থীদের ডাকছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই ডাকে সাড়া দিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন, ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
দর্শনার্থীদের উৎসাহ ও ফুলের মোহনীয়তা
দর্শনার্থীরা ফুলের ছবি তুলছেন, সেলফি নিচ্ছেন, রিল তৈরি করছেন এবং ড্রোন দিয়ে ভিডিও ধারণ করছেন। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্যমুখীর খেত ঘিরে গোমতীর চর একটি সরগরম পিকনিক স্পটে পরিণত হয়েছে। আগতদের মধ্যে কুমিল্লা ইপিজেড এলাকা থেকে পুরো পরিবারও রয়েছে, যারা ফুলের বাগান দেখতে এসেছেন।
খেতের প্রবেশপথে বাঁশের মাথায় ঝুলছে সতর্কবাণী: ফুল ছিঁড়লে ৫০০ টাকা জরিমানা এবং ছবি তুললে ৩০ টাকা টিকিটের ব্যবস্থা। একটি সাইনবোর্ডে উল্লেখ আছে, ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর ৩৩ শতাংশ জমিতে ‘আরডিএস ২৭৫’ জাতের সূর্যমুখীর বীজ বপন করা হয়েছিল।
ফুলের বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক দৃশ্য
সূর্যমুখী ফুলে মৌমাছি এবং নীল ভোমরার দল মধু সংগ্রহে ব্যস্ত। কালো-হলুদ ডোরাকাটা মৌমাছি এবং নীল পাখার ভোমরা ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। কিছু ভোমরার মাথা হলুদ রঙে ঢাকা, যা রোদ থেকে বাঁচতে হলুদ ক্যাপ পরার মতো মনে হয়। ফুলের আকারে বৈচিত্র্য লক্ষণীয়: সবচেয়ে বড় ফুলের ব্যাস প্রায় এক ফুট, আবার ছোট ফুল হাতের তালুতে এঁটে যায়।
ফুলের পাপড়ি মলিন হয়ে এলে মাঝের বৃত্তাকার অংশে কালচে ধূসর বীজ দেখা যায়, এবং ফুল নুইয়ে পড়তে শুরু করে। একই গাছে বিভিন্ন দিকে ডাল বের হয়ে আগে-পিছে ফুল ফোটে, এমনকি মাটি ছুঁই ছুঁই ডালেও ফুল দেখা যায়। কিছু ব্যতিক্রম ফুল পাপেটের মুখের মতো বা কুচকানো ‘লাভ’ চিহ্নের আকৃতি ধারণ করেছে।
কৃষি প্রকল্প ও চাষাবাদের পটভূমি
কুমিল্লা আদর্শ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবদুল কাদের জানান, নদীতে মাটি কাটা বন্ধ করতে চরের জমি চাষের আওতায় আনা হচ্ছে। সরকারি প্রকল্পের অধীনে গোমতী চরে গোল আলু, মিষ্টি আলু, ভুট্টা, শর্ষে সহ নানা শাকসবজির চাষ হয়। টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এবার প্রথমবারের মতো সূর্যমুখী চাষ শুরু হয়েছে, তেল উৎপাদনের লক্ষ্যে পাঁচটি প্রদর্শনী প্রকল্প চালু রয়েছে।
পালপাড়া ব্রিজের পাশে জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক নারী কৃষি উদ্যোক্তা সূর্যমুখী আবাদ করেছেন, তাঁর স্বামী সাব্বির মিয়া সার্বিক দেখাশোনা করছেন। শুরুতে চাষিরা আগ্রহী না হলেও, হলুদ শর্ষের পাশাপাশি সূর্যমুখী চাষ জায়গাটিকে পিকনিক স্পটে পরিণত করবে বলে বোঝানো হয়। বাস্তবে, ৩০ টাকা টিকিট কেটে দর্শনার্থীরা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, যা চাষিদের জন্য আয়ের নতুন উৎস হয়ে উঠেছে।
চাষিদের আশা ও চ্যালেঞ্জ
চাষি সাব্বির মিয়া বলেন, শুরুতে তারা রাজি না হলেও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার উৎসাহে উদ্যোগী হন। তিনি উল্লেখ করেন, দর্শনার্থীদের কারণে খেতের ক্ষয়ক্ষতি রোধে টিকিটের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। গত বর্ষার বন্যায় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, কিন্তু এখন নতুন উদ্যমে সূর্যমুখী, মিষ্টি আলু, সরিষা ও ভুট্টা চাষ করছেন, বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে লাভের আশা করছেন।
আবদুল কাদের আরও জানান, এই সাফল্য দেখে অন্য চাষিরাও সূর্যমুখী চাষে উৎসাহিত হবে, এবং তেল উৎপাদনে শর্ষের পাশাপাশি সূর্যমুখীর গুরুত্ব বাড়বে। তবে, বীজ পরিপক্ব হলে টিয়া পাখির হাত থেকে রক্ষা করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হবে, যেমন লোক রেখে পাখি তাড়ানো বা জাল দিয়ে খেত ঢেকে দেওয়া।
যাতায়াত ও পরিদর্শনের সুযোগ
কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গোমতী নদীর পালপাড়া সেতুর গোড়ায় যাওয়া যায়। সেতু থেকে ডান দিকে তাকালেই সূর্যমুখীর স্বর্গরাজ্য দেখা যাবে। একটি জমি ফুলে পরিপূর্ণ হলেও আরও দুটি জমিতে ফুল আসতে শুরু করেছে, তাই বেড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।



