তেল সংকটে ঢাকায় দীর্ঘ লাইনে ক্লান্ত পরিবার, হাসপাতালে যাত্রা বাধাগ্রস্ত
গাজীপুরের টঙ্গী থেকে রাজধানীর দয়াগঞ্জ যাওয়ার পথে তেল সংকটে পড়ে বিপাকে পড়েছেন সাইদুর রহমান ও তার পরিবার। স্ত্রী নাসিমা সুলতানা, ১১ বছরের ছেলে শাহরিয়ার নাফিস ও সাত বছরের মেয়ে সাদিয়া মেহজাবিনকে নিয়ে তিনি ইবনে সিনা হাসপাতালে ছেলেকে ডাক্তার দেখানোর জন্য যাচ্ছিলেন। কিন্তু বাসা থেকে বের হওয়ার পরই এশিয়া ফিলিং স্টেশনে তেল না পাওয়ায় তাদের যাত্রা থমকে যায়।
দীর্ঘ অপেক্ষা ও শারীরিক কষ্ট
সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখে সাইদুর লাইনে দাঁড়ান। রাস্তায় মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি, আর ফুটপাতে ছায়ায় আশ্রয় নেন নাসিমা ও দুই সন্তান। দুপুর ১২টা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা লাইনে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে জানান সাইদুর। এরপর ধীরে ধীরে লাইন এগোতে শুরু করে।
নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘বাইকে খুব বেশি তেল নেই। হয়তো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারব। কিন্তু ফেরার সময় কী হবে জানি না। রাতে যদি পথে তেল শেষ হয়ে যায়, তাহলে খুব বিপদে পড়তে হবে। তাই কষ্ট হলেও এখানেই অপেক্ষা করছি।’ তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালে ছেলে শাহরিয়ারের শরীরে ব্ল্যাড ক্যানসার ধরা পড়ে এবং সেই থেকে নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
পাম্প কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা
বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষ একটি নোটিশ টাঙিয়ে বলে রেখেছে, রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। ট্রাস্ট এনার্জির সহকারী পরিচালক মেজর আবুল আলা মুহাম্মদ তৌহিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাম্প স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছিল। গতকাল রাতেই নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সকাল থেকে যাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদেরও হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এখন তাদের পাম্পে ২৫ হাজার লিটার অকটেন ও ১৯ হাজার লিটার ডিজেল রয়েছে। ডিজেলের চাহিদা কম হওয়ায় এটি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, আর অকটেন যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ বিক্রি চলবে। তবে অস্বাভাবিক সময়ে হঠাৎ করে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হবে না বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
অন্যান্য ফিলিং স্টেশনের অবস্থা
আজ সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তেল বিক্রি বন্ধ দেখা গেছে। মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের স্যাম অ্যাসোসিয়েটস, কল্যাণপুরের কমফোর্ট ফিলিং স্টেশন, খালেক পাম্প ও সোহরাব ফিলিং স্টেশন, শ্যামলীর মেসার্স সাহিল ফিলিং স্টেশন এবং আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। এসব ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সেখানে পাওয়া যায়নি এবং অনেক পাম্পে ঢোকার মুখেই বাঁশ বা রশি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। কোথাও ‘তেল নেই’ লেখা নোটিশ টাঙানো হয়েছে।
রাইড শেয়ার চালকের অভিজ্ঞতা
ট্রাস্ট পাম্প থেকেই তেল কেনার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোটরসাইকেলচালক এনামুল হক, যিনি অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ার চালক হিসেবে কাজ করেন। গতকাল বুধবার বিকেলে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর এই পাম্প থেকেই তেল নিতে পেরেছিলেন তিনি, কিন্তু তখন পকেটে মাত্র ৩৫০ টাকা থাকায় পুরো ট্যাংক ভরতে পারেননি। আজ সকাল পৌনে ১০টার দিকে এসে আবার লাইনে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
এনামুল বলেন, ‘অনেক কষ্ট হয়। বিরক্তি লাগে—যা বলার মতো না। তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে সময় নষ্ট হয়। এই সময় কাজে থাকলে আমার কামাই হইতো।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, পকেটে টাকা থাকলে গতকালই ফুল ট্যাংক নিতেন, যা অন্তত এক সপ্তাহের চিন্তা দূর করত। আজ তিনি গতকালের আয় করা ১ হাজার ১০০ টাকার তেল নেবেন বলে জানান।
পরিবারের শেষ পর্যন্ত যাত্রা
চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর দুপুর দুইটার দিকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে বাইক নিয়ে পৌঁছান সাইদুর। তেল পান তারও আধা ঘণ্টা পর বেলা আড়াইটার দিকে। বিকেল তিনটার দিকে সাইদুর মুঠোফোনে জানান, তারা যাত্রাবাড়ী পৌঁছেছেন। সন্তানেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ায় পরিচিত এক আত্মীয়ের বাসায় কিছুটা জিরিয়ে নিচ্ছেন। এই ঘটনা ঢাকায় তেল সংকটের চিত্রটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, যা নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করছে।



