মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু বন্ধ্যাত্বকাল তৈরি হয়, যাহা সহজে দূর হয় না। ২০২০-২০২১ সালে করোনাভাইরাস মহামারি, তাহার পর বিগত চার বৎসর ধরিয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, এবং তাহা কিছুটা সামাল দিতে না দিতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে শুরু হইল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ। সুতরাং আজ, এপ্রিলের শেষার্ধে দাঁড়াইয়া, আমাদের মনে হইতে পারে-আমরা খুবই খারাপ আছি। গরমে প্রাণ যায় যায়, বিদ্যুৎ আসে-যায়, বাজারে ঢুকিলে মনে হয়-টাকার তেজ নাই, যেন তেজপাতা হইয়া গিয়াছে। মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যস্ফীতি, পরিবহনভাড়া বৃদ্ধি-সকল কিছু মিলাইয়া আমরা হয়তো ভাবিতেছি-খুব খারাপ আছি আমরা। আমরা খারাপ আছি-সম্ভবত ইহা স্বীকার করিতে কাহারোই আপত্তি নাই। বস্তুত, বিশ্বের কোনো দেশই ভালো নাই। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হইল-মানুষ যাহাকে বর্তমানের 'চরম দুর্দশা' বলিয়া মনে করে, অনেক সময় তাহাই ভবিষ্যতের তুলনায় 'সহনীয়' হইয়া থাকে। ভালো থাকিবার বিষয়টি যদি অতীত এবং ভবিষ্যতের তুলনাচিত্র হয়, তাহা হইলে আমাদের এখন সম্ভবত বলিতে হইবে-আলহামদুলিল্লাহ! আমরা ভালোই তো আছি! কারণ, আগামী দিনগুলির ব্যাপারে জ্ঞানীগুণীরা দূরদর্শীর মতো যাহা বলিতেছে, তাহা উপলব্ধি করিতে পারিলে এমনটিই মনে হইবে।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা
এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর অস্থিরতার ভিতর দিয়া অগ্রসর হইতেছে। জ্বালানির বাজারে যে অভিঘাত সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা কেবল একটি সাময়িক ঝড় নহে-বরং অনেক অর্থনীতিবিদের ভাষায় ইহা এক প্রকার 'ভূমিকম্প'। দুঃখজনকভাবে, যাহা কিছু ঘটিতেছে, এবং ঘটিতে যাইতেছে-ইহার রাশ আমাদের হাতে নাই। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তৈলের দাম গত এক বৎসরে প্রায় ৭০ ডলার হইতে ১১০-১২০ ডলারে উঠিয়াছে। বিশ্বের একটি জলপথ, যাহা দিয়া বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হইত, এখন কার্যত বন্ধ। বাস্তবতা হইল-আমাদের গ্যাসের চুলা, বিদ্যুতের সুইচ, এমনকি ভাতের হাঁড়িও সেই 'দূরের প্রণালিপথের উপর নির্ভরশীল। আমরা যুদ্ধ করি না, কিন্তু যুদ্ধের বিল নিয়মিত পরিশোধ করি।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কেবল বিদ্যুৎ বা পরিবহনের খরচ বাড়ায় না-ইহা কৃষি, শিল্প, এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে সমগ্র সমাজকে আক্রান্ত করে। ফলে অর্থনীতি এমন এক অবস্থার দিকে ধাবিত হয়, যেইখানে প্রবৃদ্ধি কমিয়া যায়, অথচ মূল্যস্ফীতি বাড়িতে থাকে-এক ভয়াবহ দ্বৈত সংকট। আমাদের অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভরশীল আমদানিকৃত জ্বালানি ও প্রবাসী আয়ের উপর। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হইলে এই দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়িবে-একদিকে বাড়িবে আমদানি ব্যয়, অন্যদিকে কমিতে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহ। ফলত বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ বাড়িবে, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাইবে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
ইহার সঙ্গে যুক্ত হইতেছে আর এক গভীরতর বিপদ-প্রাকৃতিক। কথিত 'সুপার এল নিনো'র সম্ভাবনা ইতিমধ্যে আলোচনায় আসিয়াছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ যখন প্রকাশ পায়, তখন তাহা শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটায় না; বরং খাদ্য উৎপাদন, জলসম্পদ, এবং মানবজীবনের মৌলিক নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করিয়া তোলে। অতএব, আমরা এক দ্বিমুখী সংকটের সম্মুখীন-একদিকে মানুষের সৃষ্ট যুদ্ধ, অন্যদিকে প্রকৃতির অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া।
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি
তবে এই সমস্ত বিশ্লেষণের অন্তরালে একটি গভীরতর দার্শনিক সত্য লুকাইয়া আছে। তাহা হইল-মানবসভ্যতা বারংবার সংকটের মধ্য দিয়াই নিজেকে পুনর্গঠিত করিয়াছে। প্রতিটি দুর্যোগের ভিতরেই এক নূতন সম্ভাবনার বীজ নিহিত থাকে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কেবল তখনই বিকশিত হয়, যখন মানুষ বাস্তবতাকে অস্বীকার না করিয়া তাহার মুখোমুখি দাঁড়াইতে সাহস করে। এই ক্ষেত্রে বর্তমান সময়টাকে আমরা দুইভাবে দেখিতে পারি-একটি দুঃসময় হিসাবে, অথবা একটি সতর্ক সংকেত হিসাবে। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের হতাশ করিবে, দ্বিতীয়টি আমাদের প্রস্তুত করিবে। আর ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ হইতে আমরা বলিতেই পারি-এখন যেমন আছি, আলহামদুলিল্লাহ! এই বেশ ভালো আছি!



