রাজশাহীতে তীব্র তাপদাহের মাঝে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে লিচু বাগানগুলোতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাকার আগেই গাছে গাছে লিচু ফেটে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে ঝরেও পড়ছে। এতে চাষিদের মধ্যে দুশ্চিন্তা বেড়েছে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তাপমাত্রার রেকর্ড ও আবহাওয়ার বৈপরীত্য
এপ্রিলের শুরু থেকেই রাজশাহীতে মৃদু থেকে মাঝারি তাপদাহ বিরাজ করছে। বুধবার (২২ এপ্রিল) দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা এ মৌসুমের সর্বোচ্চ। এর আগে মৃদু ও মাঝারি তাপদাহ চলছিল এপ্রিলজুড়ে। এর মধ্যেই হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতির এই বৈপরীত্য সরাসরি প্রভাব ফেলেছে লিচু বাগানগুলোতে।
লিচু বাগানের বর্তমান অবস্থা
নগরীর চন্ডিপুর এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস চত্বরে থাকা লিচু গাছগুলোতে দেখা গেছে, গাছে ফল ধরেছে এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পাকার উপযোগী হবে। কিন্তু প্রতিটি থোকায় দু-একটি করে লিচু এরইমধ্যে ফেটে গেছে। অনেক ফলের গায়ে কালচে ও খয়েরি দাগ পড়েছে। এ ছাড়া কিছু ছোট আকারের লিচু ঝরে মাটিতেও পড়ে থাকতে দেখা যায়।
একই চিত্র দেখা গেছে নগরের রায়পাড়া এলাকার একটি বাগানেও। বাগানি রফিকুল ইসলাম জানান, গরমে লিচু ঝরে পড়া বা ফেটে যাওয়া নতুন কিছু নয়, তবে এবার এর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এতে তারা ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন এবং উৎপাদন কম হবে বলে মনে করছেন।
কৃষি বিভাগের ব্যাখ্যা ও পরামর্শ
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, তাপদাহের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিপাতের ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় তীব্র গরমে থাকার পর হঠাৎ বৃষ্টি হলে লিচুর ভেতরের অংশ দ্রুত স্ফীত হয়, কিন্তু খোসা সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে ফেটে যায়। মাঠপর্যায় থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি আরও বলেন, খরার মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিপাতই লিচু ফেটে যাওয়ার মূল কারণ। এ থেকে গাছকে রক্ষা করতে হলে খরা চলাকালেও গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দিতে হবে। প্রয়োজনে গাছে পানি স্প্রে করা যেতে পারে। পাশাপাশি হরমোন, বোরণ বা জিংক প্রয়োগ করলে কিছুটা প্রতিকার মিলতে পারে।
উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয়
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান থেকে উৎপাদন হয়েছিল ৩ হাজার ৭৬৮ মেট্রিক টন। চলতি বছর বাগানের পরিমাণ সামান্য কমে ৫২৮ হেক্টরে দাঁড়ালেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে কিছুটা বেশি। তবে বর্তমান আবহাওয়াজনিত কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তাপদাহ আর অনিয়মিত বৃষ্টির এমন প্রভাবে রাজশাহীর সুস্বাদু লিচু উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চাষিরা এখন তাকিয়ে আছেন আবহাওয়ার অনুকূল পরিবর্তনের দিকে।
জনজীবনে তাপদাহের প্রভাব
এদিকে প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলের জনজীবন। বিশেষ করে খেটে খাওয়া ও কর্মজীবী মানুষের কষ্ট বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। এর মধ্যেই বুধবার (২২ এপ্রিল) রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় হিট স্ট্রোকে একজনের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যমতে, গত কয়েকদিন ধরে রাজশাহীতে তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। তীব্র রোদের পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় গরম আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দিনের বেলায় শহরের প্রধান সড়কগুলোতে মানুষের উপস্থিতি একেবারেই কম। জরুরি প্রয়োজনে যারা ঘর থেকে বের হচ্ছেন, তাদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে।
শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা
এই বৈরী আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাচালক, দিনমজুর ও নির্মাণশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ জীবিকার তাগিদে তীব্র রোদ উপেক্ষা করেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে অনেককেই রাস্তার পাশে ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। গরমে একটু স্বস্তি খুঁজতে অনেকে ভিড় করছেন রাস্তার পাশের আখের রসের দোকানগুলোতে।
জীবিকার তাগিদে চারঘাট উপজেলা থেকে শহরে রিকশা চালাতে আসা ৬০ বছর বয়সী আব্দুল রশিদ নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান। তিনি বলেন, সকাল আটটায় শহরে এসেছি রিকশা চালাতে, কিন্তু গরমের জন্য খুব একটা ভাড়া মারতে পারিনি। একদিকে রোদের তীব্র তাপ, অন্যদিকে রাস্তায় যাত্রী কম থাকায় তেমন একটা রোজগারও করতে পারিনি।
বিদ্যুৎ সংকট জনজীবনকে দুর্বিষহ করছে
অন্যদিকে তীব্র গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের লুকোচুরি। নগরীর শিরোইল কলোনির বাসিন্দা মোস্তাক হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একদিকে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় জীবন অতিষ্ঠ, তার ওপর চলছে বিদ্যুতের ভেলকিবাজি। আমরা এই বিদ্যুতের জ্বালা থেকে দ্রুত মুক্তি চাই।
তাপদাহ ও লোডশেডিংয়ের এই দ্বৈত সংকটে রাজশাহী অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন এখন চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসকরা প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়া এবং বেশি বেশি তরল জাতীয় খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন।



