জ্বালানিসংকটে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত
জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। গতকাল শাহবাগ, বাংলামোটরসহ বিভিন্ন এলাকায় অফিসফেরত ও সাধারণ যাত্রীদের বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ রাস্তার ধারে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়া এবং পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের কারণে রাজধানীর প্রায় ২০ শতাংশ বাস সড়ক থেকে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
যাত্রীদের তুলনায় বাসের সংখ্যা অনেক কমে গেছে
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির হিসেব অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার বাস চলাচল করে। কিন্তু বর্তমানে শুধু ডিজেল সংকটের কারণে ২০ শতাংশ বাস কম নামছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এম এস আহমেদ খোকন স্বীকার করেছেন যে রাজধানীতে ২০-২৫ শতাংশ বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
চালকরা জানাচ্ছেন, জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে গিয়েই তাদের দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে। শুভযাত্রা পরিবহনের চালক বিল্লাল হোসেন বলেন, "প্রতিদিন তেল সংগ্রহ করতে পাম্পে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় চলে যায়। এই সময়ে অন্তত একটি অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হতো।"
ঘোষণা ছাড়াই বেড়েছে বাস ভাড়া
সরকারি ভাড়া পুনর্নির্ধারণের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও অনেক রুটে চালক ও হেলপাররা ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে:
- স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে
- দূরপাল্লা বা ব্যস্ত রুটে ২০০-৩০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে
- যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে চালক ও হেলপারদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে
একই ধরনের অভিযোগ এসেছে যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, পল্টন, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকার যাত্রীদের কাছ থেকেও। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, দৈনন্দিন যাতায়াত এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, অথচ আয় বাড়েনি।
আন্তঃজেলা বাসেও ভাড়ার চাপ বেড়েছে
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-মৌলভীবাজার রুটে আগে যেখানে ভাড়া ছিল ৫৭০ টাকা, এখন তা বেড়ে ৬২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পরিবহন মালিকদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়েছে।
পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০২২ সালে নির্ধারিত ভাড়া এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। সেই সময় দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২.২০ টাকা এবং মহানগরে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো সমন্বয় হয়নি। মালিকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাড়া না বাড়ালে লোকসান দিয়ে সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
লেগুনা ও অন্যান্য পরিবহনেও একই প্রবণতা
বাড়তি ভাড়ার প্রভাব শুধু বাসে সীমাবদ্ধ নয়, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাইড শেয়ারিং সেবাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে যাত্রী সংকটকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ বেশি।
নুর নবী মোস্তফা নামের এক যাত্রী অভিযোগ করে জানান, "কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটগামী বাসে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি ভাড়া রাখা হচ্ছে।"
সমিতির নির্দেশনা ও সরকারের প্রতি আহ্বান
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো: সাইফুল আলম গতকাল এক বিবৃতিতে সকল পরিবহন মালিককে সরকার কর্তৃক বাস ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত বর্তমান ভাড়ার চেয়ে বেশি না নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটারে ১৫ টাকা করা এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে গাড়ির মেনটেনেন্স খরচের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সময়ে ভাড়া সমন্বয় করার জন্য সরকারের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান ও দাবি জানিয়েছেন।
যাত্রীকল্যাণ সংগঠনগুলোর দাবি, সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণের আগেই মালিক ও কিছু পরিবহন সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছে, যা যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। তারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভাড়া সমন্বয় করা উচিত।



